রাজশাহী কলেজের লাল দালানের সামনে বিকেলের শেষ আলোটা পড়তেই বদলে যায় দৃশ্যপট। শিক্ষার্থীদের কোলাহল, রাস্তায় ছুটে চলা যানবাহনের শব্দ আর বাতাসে ভেসে আসা গরম বিরিয়ানির সুবাস -সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আমেজ তৈরি হয়। সেই আমেজের কেন্দ্রে রয়েছে ছোট্ট একটি ইফতার স্টল, যেখানে জড়িয়ে আছে পাঁচ তরুণের স্বপ্ন ও আত্মনির্ভরতার গল্প।
কলেজের বিবিএ বিভাগের পাঁচ শিক্ষার্থী সুমাইয়া, সূচি, নাহিদ, রোকন ও খালেক, তারা নিজেদের হাত খরচের টাকা জমিয়ে শুরু করেছেন এই উদ্যোগ। দ্বিতীয় রমজান থেকে যাত্রা শুরু করা তাদের ইফতার স্টলটি এখন ক্যাম্পাসের পরিচিত এক ঠিকানায় পরিণত হয়েছে।
পড়াশোনার ফাঁকে অনেকেই যখন সময় কাটান আড্ডায়, তখন এই পাঁচ শিক্ষার্থী ভেবেছেন ভিন্ন কিছু করার কথা। নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন থেকেই জন্ম নেয় উদ্যোগটি। নাহিদ বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম নিজেদের জন্য কিছু করতে। প্রথম দিন খুব অল্প আইটেম নিয়ে বসেছিলাম। কিন্তু মানুষের সাড়া দেখে আমরা অবাক। এখন প্রতিদিনই আয়োজন একটু একটু করে বড় হচ্ছে।”
তাদের স্টলে ৪০ ও ৬০ টাকার প্যাকেজে গরম গরম বিরিয়ানি, ছোলা, খেজুর ও বেগুনি পরিবেশন করা হয়। স্বল্প মূল্যে ‘বাড়ির স্বাদ’ দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য।
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী হওয়ায় শুরু থেকেই তারা গুরুত্ব দিয়েছেন মান নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যবিধিতে। সরেজমিনে দেখা যায়, মাথায় ক্যাপ ও হাতে গ্লাভস পরে অত্যন্ত পরিচ্ছন্নভাবে খাবার পরিবেশন করছেন তারা। প্রতিদিন গড়ে ছয় হাজার টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে বলে জানান উদ্যোক্তারা। তবে তাদের কাছে শুধু বিক্রির অঙ্কই বড় নয়, গ্রাহকের আস্থা অর্জনই প্রধান সাফল্য।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আলামিন বলেন, “এটা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। আমরা চাই ওরা এই উদ্যোগটা আরও বড় করুক। বাজারের অনেক ইফতারই অস্বাস্থ্যকর মনে হয়। কিন্তু সহপাঠীদের তৈরি এই খাবার নিরাপদ ও সুস্বাদু। বিশেষ করে বিরিয়ানির স্বাদটা একদম বাড়ির মতো।”
নিয়মিত আরেক ক্রেতা নূর বলেন, “আমরা বইয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প পড়ি। কিন্তু সামনে এভাবে সহপাঠীদের উদ্যোগ নিতে দেখা সত্যিই আলাদা অনুভূতি। আমরা এখন বন্ধুরা মিলে এখান থেকেই ইফতার কিনি।”
শুধু শিক্ষার্থী নয়, সাধারণ পথচারীরাও এই তরুণদের উৎসাহ দিতে ভিড় করছেন। ইফতার কিনতে আসা পথচারী রাসেল বলেন, “আমি প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে যাই। প্রথম দিন দেখেছিলাম কয়েকজন শিক্ষার্থী ছোট করে বসেছে। এখন দেখি বেশ ভিড়। সবচেয়ে ভালো লাগে, ওরা যেভাবে শৃঙ্খলা আর পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে কাজ করছে। আমাদের সময়ে পড়াশোনার পাশাপাশি এমন উদ্যোগ নেওয়ার সাহস খুব একটা দেখা যেত না। এখনকার ছেলেমেয়েরা নিজেরা কিছু করতে চাইছে, এটা দেশের জন্য ইতিবাচক সংকেত। এদের এই মনোভাব থাকলে ভবিষ্যতে বড় ব্যবসায়ী কিংবা সফল উদ্যোক্তা হওয়া কঠিন কিছু নয়।"
হয়তো ঈদের পর স্টলটি আর থাকবে না, কিন্তু থেকে যাবে একটি বার্তা -সুযোগের অপেক্ষায় বসে না থেকে উদ্যোগ নিতে জানলেই তরুণরাই বদলে দিতে পারে নিজেদের ভবিষ্যৎ। আর সেই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে ঠিক এমনই একটি সাধারণ বিকেল থেকে, রাজশাহী কলেজের লাল দালানের সামনে।
৬ ঘন্টা ২৫ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ২৭ মিনিট আগে
১০ ঘন্টা ১৪ মিনিট আগে
১১ ঘন্টা ১০ মিনিট আগে
১২ ঘন্টা ৪ মিনিট আগে