নোয়াখালীর সেনবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবদুর রহিম সরকারকে নোয়াখালী জেলা পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তাকে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য, ছবি ও প্রচারণা দেখা যায়।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেন নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) আহমেদ পেয়ার ।
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার রাতে উপজেলার কাবিলপুর ইউনিয়নের বটতলা বাজার এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মিছিলের ঘটনায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। এ ছাড়া উপজেলার বাতানিয়া গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা ও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী শাহজাহান খোকনের বাড়িতে আয়োজিত ভূরিভোজে ওসির অংশ নেওয়ার অভিযোগ উঠে।
ওসির দায়িত্বে থাকা সেনবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হযরত আলী মিলন বলেন, শনিবার সন্ধ্যায় ওসি প্রত্যাহারের পর চলে গেছে। তবে কি কারণে প্রত্যাহার করা হয়েছে তা জানিনা। বটতলা এলাকায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিছিলের ঘটনায় শনিবার থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়। মামলায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের পাঁচ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এতে অজ্ঞাতনামা আরও ৩০ থেকে ৩৫ জনকে আসামি করা হয়।
তবে তাকে ক্লোজ করার প্রকৃত কারণ কী-এ বিষয়ে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ছাড়া কোনো একটি কারণকে চূড়ান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এরই মধ্যে ব্যক্তিগত বিরোধ, মাদক মামলায় আটক এক ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কথিত তদবির এবং স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে ওসির সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য সামনে এসেছে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার বাতানিয়া গ্রামের বাসিন্দা এ কে এম গোলাম সরোয়ারের সঙ্গে একই এলাকার চট্টগ্রামের সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান খোকনের পারিবারিকভাবে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। দীর্ঘদিনের এ বিরোধের প্রভাব সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে পড়েছে কি না, তা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে।
মাদক মামলায় আটক ব্যক্তিকে ছাড়ানোর তদবিরের অভিযোগ:
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সম্প্রতি বাতানিয়া গ্রামের আবদুর রহিম নামে এক ব্যক্তিকে মাদকসহ আটক করে সেনবাগ থানা পুলিশ। তাকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য এ কে এম গোলাম সরোয়ার তদবির করেছিলেন-এমন অভিযোগ রয়েছে।
তবে ওই অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথি, মামলার তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। জানা গেছে, ওসি আবদুর রহিম সরকার ওই ব্যক্তিকে ছেড়ে দেননি।
স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন, মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশ কোনো আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে না দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে ওসিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রচারণা হয়েছে, তার সঙ্গে পূর্বের কোনো বিরোধের যোগসূত্র রয়েছে কি না-তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
ব্যবসায়ীর দাওয়াত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা:
এরই মধ্যে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান খোকনের আমন্ত্রণে ওসি আবদুর রহিম সরকার একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে ওসির উপস্থিতির বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে এবং ব্যবসায়ী খোকনকে ঘিরে বিভিন্ন বক্তব্য ও ছবি প্রচার করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন-কোনো ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত বা সামাজিক অনুষ্ঠানে একজন পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতি কি নিজেই কোনো পক্ষপাতিত্বের প্রমাণ? নাকি এর সঙ্গে অন্য কোনো তথ্য-প্রমাণও রয়েছে? বিষয়টি নির্ধারণের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার বাইরে বাস্তব নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
ব্যবসায়ী খোকনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন:
সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, মো. শাহজাহান খোকন কোনো সময় আওয়ামী লীগ বা এর কোনো অঙ্গসংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন কিংবা কোনো কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন-এমন তথ্য তাদের জানা নেই।
তাদের ভাষ্য, একজন ব্যবসায়ী হিসেবে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি বা মন্ত্রীদের সঙ্গে ব্যবসায়িক কিংবা সামাজিক প্রয়োজনে সাক্ষাৎ ও ছবি তোলা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু শুধু ছবি বা সাক্ষাতের ভিত্তিতে কারও রাজনৈতিক পদ-পদবি বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নির্ধারণ করা যায় কি না-এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতার দাবি থাকলে সংশ্লিষ্ট কমিটির তালিকা, সরকারি বা দলীয় নথি এবং দায়িত্বশীল সূত্রের বক্তব্যের মাধ্যমে তা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
মাদকবিরোধী অভিযানে ওসির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা:
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, গত ৯ মে ২০২৬ সেনবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে যোগদানের পর আবদুর রহিম সরকার কঠোরহস্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মাদকবিরোধী অভিযান ও অপরাধ দমনে পুলিশি তৎপরতা চালিয়ে আসছিলেন।
তার দায়িত্ব পালনকালে সেনবাগে মাদকবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। মাদক কারবার ও সেবনের বিরুদ্ধে পুলিশের নিয়মিত অভিযানকে স্থানীয়দের একটি অংশ ইতিবাচকভাবে দেখছেন বলেও জানা গেছে।
তবে কোনো কর্মকর্তার কর্মদক্ষতা বা ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের অভিযান, মামলা, উদ্ধার, গ্রেপ্তার এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা কতটা গ্রহণযোগ্য?
গত ১৯ সেপ্টেম্বর ওসি আবদুর রহিম সরকারকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বক্তব্য ও প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। এসব প্রচারণার পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ, কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিক্রিয়া কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না-তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একতরফা প্রচারণার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষ, জেলা পুলিশ, বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ কিংবা আইনগত উপযুক্ত ফোরামে লিখিত অভিযোগ করা উচিত।
অভিযোগের সঙ্গে প্রয়োজনীয় নথি ও প্রমাণ উপস্থাপন করলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার সুযোগ থাকে।
একইভাবে কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিক পরিচয়, মাদক সংশ্লিষ্টতা, প্রভাব বিস্তার কিংবা অন্য কোনো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত করার আগে মামলা, জিডি, আদালতের নথি, পুলিশি প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য যাচাই করাও জরুরি।
প্রকৃত ঘটনা জানতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ যাচাই:
ওসি আবদুর রহিম সরকারকে জেলা পুলিশ লাইনে ক্লোজ করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে যে আলোচনা চলছে, সেখানে কয়েকটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। মাদক মামলায় আটক আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার প্রকৃত তথ্য কী, তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য আদৌ কোনো তদবির হয়েছিল কি না, এ কে এম গোলাম সরোয়ারের সঙ্গে মো. শাহজাহান খোকনের জমিজমা বিরোধের প্রকৃতি কী, সামাজিক অনুষ্ঠানে ওসির উপস্থিতির প্রকৃত প্রেক্ষাপট কী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অভিযোগগুলোর পেছনে কোনো প্রামাণ্য নথি রয়েছে কি না-এসব প্রশ্নের উত্তরেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
এ বিষয়ে এ কে এম গোলাম সরোয়ার, সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান খোকন, মাদক মামলায় আটক আবদুর রহিম এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ওসি আবদুর রহিম সরকারকে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করার বিষয়ে নোয়াখালী জেলা পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনাটির প্রকৃত কারণও পরিষ্কার হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, ছবি কিংবা একপক্ষের বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমেই এ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটন সম্ভব বলে মনে করছেন এ প্রতিবেদক ও স্থানীয়রা।
নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) আহমেদ পেয়ার বলেন, একজনের বাড়িতে গিয়ে দাওয়াত খাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওসি আবদুর রহিম সরকারকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি।
১ ঘন্টা ১০ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ৪৫ মিনিট আগে
৪ ঘন্টা ৫৫ মিনিট আগে
৫ ঘন্টা ৩২ মিনিট আগে
৬ ঘন্টা ২ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ২০ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ৩১ মিনিট আগে