মো. নুরুল আমিন
লেখক- অধ্যক্ষ, প্রিন্সিপাল কাজী ফারুকী কলেজ।
কাজী নজরুল ইসলাম (1899-1976 খ্রি.) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন খ্যাতিমান কবি।
তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত প্রাপ্ত বাঙালির প্রাণের কবি। কাজী নজরুলইসলাম একাধারে কবি, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক,গীতিকার ও সুরকার। তিনি বাংলা ভাষার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। পশ্চিমবঙ্গেরবর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ সালের আজকের এইদিনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম ছিল দুখু মিয়া। বাবা ছিলেন কাজী ফকির আহমেদ ও মা জাহিদাখাতুন। বাবা স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মাজারের খাদেম ছিলেন। ১৯০৯ সালে গ্রামেরমক্তব থেকে কুরআন, ইসলাম ধর্ম, দর্শন এবং ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে নিম্ন প্রাইমারিপাশ করেন। পিতার মৃত্যুর পর পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে তিনি পড়াশোনা বাদ দিয়েমাত্র দশ বছর বয়সে জীবিকা উপার্জনের তাগিদে একই মক্তবে শিক্ষকতা শুরু করেন। একইসাথে তিনি মাজারের খাদেম এবং মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজ শুরু করেন। জীবিকারতাগিদে বাল্যকালে চায়ের দোকানে রুটি বানানোর কাজ করেছেন। ১৯১৪ সালে নজরুলময়মনসিংহের দরিরামপুর স্কুল থেকে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং রাণীগঞ্জ সিয়ারসোলরাজস্কুলে (১৯১৫-১৯১৭) অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। এরপর তিনি প্রি-টেস্টপরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করে সেনাবাহিনীর ৪৯নং বাঙালি পল্টনে যোগদান করেন।কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গি আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর।এ কারণেই তিনি ভূষিত হন ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে। আজীবন সংগ্রাম করেছেন শোষিত মানুষেরমুক্তির জন্য। তিনি কবিতার মাধ্যমে সমাজে উদ্ভূত পরিস্থিতির বিভিন্ন বাস্তব চিত্রঅঙ্কন করেছেন। সমাজের নিপীড়িত মানুষের আবেগ-অনুভূতির কথা কবিতার মাধ্যমে প্রথমব্যক্ত করেন তিনি। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ সমাজকে শোষণ ও উৎপীড়ন থেকে মুক্তকরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বিভিন্ন কবিতা লিখেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য তাঁর রচিত‘বিদ্রোহী’ নামক কবিতায় তিনি বলেন-যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল/ আকাশে বাতাশে ধ্বনিবে না /অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না/ বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত। কবিতায় ব্রিটিশশাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা করলেন। প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন সকল অন্যায় শোষণআর নিযার্তনের বিরুদ্ধে। তাই তিনি তার ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় উচ্চারণ করলেন-তোরা সবজয়ধ্বনি কর/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল-বোশেখির ঝড়। তিনি কল্পনা করেছেন একসাম্যবাদী সমাজের, যেখানে নেই শোষণ, বৈষম্য আর সাম্প্রদায়িক বিভেদ। এতদবিষয়েরবর্ণনা পাওয়া যায় কবির ‘সাম্যবাদী’ কবিতায়। কবির ভাষায়-গাহি সাম্যের গান, যেখানে আসিয়া একহয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান, যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রিশ্চান। ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যের ‘শাত-ইলআরব’, খেয়াপারের তরণী’ ‘কোরবানী’ আগমনী প্রভৃতি কবিতায় যুব সমাজকে বিদ্রোহের পথেএগিয়ে আসার জন্য আহ্বান করেন। ‘কামাল পাশা’ ও ‘আনোয়ার’ কবিতায় কবি তারুণ্যকেঅসীম সাহসিকতার ও ত্যাগের মানসিকতা সৃষ্টির দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন। যেমন: আনোয়ারআনোয়ার/ দিলওয়ার তুমি, জোর তলওয়ার হানো আর/ নেস্ত-ও-নাবুদ কর, মারো যত জানোয়ার। এরপর‘কোরাবানী’ কবিতায় যুবসমাজকে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ও প্রতিবাদী হওয়ারআহ্বান জানান। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর ত্যাগ ও সাহসিকতায় উদ্বুদ্ধ হতে আহবানকরেন। কবির ভাষায়- ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন। জোঁর চাই, আর যাচনা নয়/ কোরবানী-দিনআজ না ওই? সমাজ জীবনে সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে বেঁচে থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনিবিদ্রোহী কণ্ঠে ঘোষণা দিলেন-আমি দুর্বার/ আমি ভেঙে করি সব চুরমার/ আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল/ আমি দ’লেযাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল। নজরুল তাঁর কবিতার মাধ্যমে নারী সমাজের মুক্তি এবং নারীঅধিকারকে প্রাধান্য দিয়েছেন। পুরুষের সমাজ জীবনে নারীর অবদানের কথাও চিত্রিতকরেছেন। কবি তাঁর ‘সাম্যবাদী’ কাব্যের ‘নারী’ নামক কবিতায় বলেছেন,আমার চক্ষে পুরুষ-রমণীকোনো ভেদাভেদ নাই/ বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধের তার করিয়াছেনারী, অর্ধেক তার নর। নারীর অবদানের কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে কবি বলেন- এ বিশ্বে যত ফুটিয়েছেফুল, ফলিয়াছে যত ফল/ নারী দিল তাহে রূপ-রস-সূধা-গন্ধ সুনির্মল। পুরুষের জীবনে নারীর ভূমিকার কথাতিনি বর্ণনা করেছেন এভাবে-দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস, নিশিথে হয়েছ বঁধূ/ পুরুষ এসেছে মরুতৃষা লয়ে নারীযোগায়েছে মধু।/ শষ্য ক্ষেত্র উর্বর হল, পুরুষ চালান হাল/ নারী সেই মাঠে শষ্যরোপিয়া করিল সুশ্যামল/ নর বাহে হল,নারী বহে জল, সেই জল মাটি মিশে/ ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে। সমাজে জীবনের নারীরত্যাগ ও তিতিক্ষার কথা প্রকাশ করে কবি বলেন- জগতের যত বড় বড় জয়, বড় বড় অভিযান/ মাতা ভগ্নিবধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহান। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সাহিত্যকর্মে নারী-পুরুষকে সমানভাবেদেখেছেন। তিনি নারীকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠিত হননি। তাঁর মতে, পৃথিবীতে সবকল্যাণকর অবদানের অধিকারী হচ্ছে নারী। নারী কবিতার মাধ্যমে তিনি নারীর ক্ষমতায়নেরদিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে মানবতাকে সবচেয় বড় করে দেখেন।ধর্মীয় ভেদাভেদ ও পার্থক্য ভুলে তিনি সমাজের মানবতার শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলেছেন। ‘মানুষ’কবিতায় তিনি বলেন, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,/ নহে কিছু মহীয়ান। ধর্মীয় ও জাতিগত বিভেদ ভুলেমানবতাকে বিশেষ স্থান দিয়েছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি মনে করেন, মানুষের মাঝেসাম্য বা মৈত্রী থাকা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কোন অবস্থায় ধর্মীয় অনুভূতির মাধ্যমেমানবতাকে পরাজিত করা যাবে না। কবি ধর্ম-জাতি ও সম্প্রদায় ভেদাভেদ উপেক্ষা করেন।তিনি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলেসমাজের সকলকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। কবির ভাষায়- তোমাতে রয়েছে সকল কেতাবসকল কালের জ্ঞান/ সকল শাস্ত্রে খুঁজে পাবে সখা, খুলে দেখ নিজ প্রাণ/ তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার/তোমার হৃদয় বিশ্ব দেউল সকলের দেবতার। ধর্ম বিষয়ে অপব্যাখ্যা ভণ্ড ধর্ম ব্যবসায়ীদের ধর্মেরনামে মনগড়া নিয়ম নীতির বিরুদ্ধে কবির ক্ষোভ প্রকাশ পায় ‘মানুষ’ নামক কবিতায়। কোথাচেঙ্গিস, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়? ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা দেওয়া দ্বার! খোদার ঘরে কে কপাটলাগায়, কে দেয় সেখানে তালা.../ হায়রে ভজনালয়/ তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ডগাহে স্বার্থের জয়। ‘মোহররম’ নামককবিতায় ১০ মোহররমে প্রচলিত কুসংস্কার পরিহার করে এ দিনে কারবালা প্রান্তেরহৃদয়বিদারক ঘটনার থেকে শিক্ষা নিয়ে ধর্মীয়ত্যাগে উদ্বুদ্ধ হতে যুবসমাজকে তিনি আহ্বানজানিয়েছেন। তিনি বলেন, ফিরে এলো আজ সেই মোহররম মাহিনা/ ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না। তিনিজীবনকে, সমাজকে আপন আয়নার দেখেছেন আর ছবির মতো করে তুলে এনেছেন তার একেরপর এক কবিতায়। সমাজের সকল অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খলার বিরুদ্ধে নজরুলের সুদৃঢ় অবস্থানেরপ্রতিফলন নজরুল তাঁর কবিতায় প্রকাশ করেছেন। তিনি দেশের সংকটময় মুহূর্তে নিজেকেমানুষের পথ নির্দেশক হিসেবে মাথা উচুঁ করে নেতৃত্ব দানে আহ্বান জানিয়ে সমাজের মানুষেরমধ্যে স্বাধীন চেতনা জাগ্রত করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক।তিনি ছিলেন সাম্যের কবি। সাম্যবাদী কবি। বাঙালির প্রাণের কবি।