তরুণদের ‘থ্রি-জিরো’ ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে তৈরির আহ্বান জানালেন ড. বৃষ্টি ও তাপমাত্রা নিয়ে সুখবর ইউনূস ২-৪ বছর থাকলে দেশ সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার পথে এগিয়ে যাবে : ব্যারিস্টার ফুয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক ইস্যুর ইতিবাচক সমাধান হবে' গাইবান্ধায় বি.এন.পি. অফিস ভাংচুরের মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা রঞ্জু ও জসিম গ্রেফতার। লোহাগাড়া উপজেলা যুবদল কতৃক ঈদ পূনর্মিলনী ও কারা নির্যাতিত নেতাকর্মীদের সম্মননা স্মারক প্রদান অনুষ্টান সম্পন্ন। শ্রীমঙ্গলে দুর্লভ প্রজাতির লজ্জাবতী বানর উদ্ধার অতিরিক্ত যাত্রী তোলায় যমুনায় নৌকাডুবি : একজনের লাশ উদ্ধার, নিখোঁজ ২ টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে পরকীয়া সন্দেহে স্বামীর লিঙ্গ কেটে দিলো স্ত্রী চৌমুহনীর নৃশংস হামলায় মন্দিরে নতুন "বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা" জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দের মন্দির পরিদর্শন অভয়নগরে ফুচকা খেয়ে অসুস্থ রুগীদের পাশে খেলাফত মজলিসের নেতৃবৃন্দ এক্ষুনি বিশ্বনাথের ইউএনও'র লাগাম টেনে ধরুন ওয়াপদার নিচে ঘের মালিকদের বসানো অবৈধ পাইপ লাইন অপসারনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে" ---খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মোঃ ফিরোজ সরদার। এসএসসি পরীক্ষার্থী ২০২৫ বিদায়ী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দাবিতে চিলমারীতে মানববন্ধন আনুলিয়ায় প্লাবিত মানুষের মাঝে সুপেয় পানি বিতরণ শুরু জমকালো আয়োজনে যদুনাথ রি-ইউনিয়ন ক্রিকেট টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত প্লাবিত এলাকা পরিদর্শণে বিভাগীয় কমিশনার, ত্রাণ ও মেডিকেল সহায়তা প্রদান চকরিয়ায় বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুন পুড়ে ৮ বসতবাড়ি ঈদের ছুটিতে মৌলভীবাজারের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের ঢল নেমেছে

নজরুলের কবিতায় সাম্যবাদ



মো. নুরুল আমিন 
লেখক- অধ্যক্ষ, প্রিন্সিপাল কাজী ফারুকী কলেজ।

কাজী নজরুল ইসলাম (1899-1976 খ্রি.) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন খ্যাতিমান কবি।
তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত প্রাপ্ত বাঙালির প্রাণের কবি। কাজী নজরুল
ইসলাম একাধারে কবি, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক,
গীতিকার ও সুরকার। তিনি বাংলা ভাষার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। পশ্চিমবঙ্গের
বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ সালের আজকের এইদিনে জন্ম
গ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম ছিল দুখু মিয়া। বাবা ছিলেন কাজী ফকির আহমেদ ও মা জাহিদা
খাতুন। বাবা স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মাজারের খাদেম ছিলেন। ১৯০৯ সালে গ্রামের
মক্তব থেকে কুরআন, ইসলাম ধর্ম, দর্শন এবং ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে নিম্ন প্রাইমারি
পাশ করেন। পিতার মৃত্যুর পর পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে তিনি পড়াশোনা বাদ দিয়ে
মাত্র দশ বছর বয়সে জীবিকা উপার্জনের তাগিদে একই মক্তবে শিক্ষকতা শুরু করেন। একই
সাথে তিনি মাজারের খাদেম এবং মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজ শুরু করেন। জীবিকার
তাগিদে বাল্যকালে চায়ের দোকানে রুটি বানানোর কাজ করেছেন। ১৯১৪ সালে নজরুল
ময়মনসিংহের দরিরামপুর স্কুল থেকে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং রাণীগঞ্জ সিয়ারসোল
রাজস্কুলে (১৯১৫-১৯১৭) অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। এরপর তিনি প্রি-টেস্ট
পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করে সেনাবাহিনীর ৪৯নং বাঙালি পল্টনে যোগদান করেন।
কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গি আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর।
এ কারণেই তিনি ভূষিত হন ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে। আজীবন সংগ্রাম করেছেন শোষিত মানুষের
মুক্তির জন্য। তিনি কবিতার মাধ্যমে সমাজে উদ্ভূত পরিস্থিতির বিভিন্ন বাস্তব চিত্র
অঙ্কন করেছেন। সমাজের নিপীড়িত মানুষের আবেগ-অনুভূতির কথা কবিতার মাধ্যমে প্রথম
ব্যক্ত করেন তিনি। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ সমাজকে শোষণ ও উৎপীড়ন থেকে মুক্ত
করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বিভিন্ন কবিতা লিখেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য তাঁর রচিত
‘বিদ্রোহী’ নামক কবিতায় তিনি বলেন-যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল/ আকাশে বাতাশে ধ্বনিবে না /
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না/ বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত। কবিতায় ব্রিটিশ
শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা করলেন। প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন সকল অন্যায় শোষণ
আর নিযার্তনের বিরুদ্ধে। তাই তিনি তার ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় উচ্চারণ করলেন-তোরা সব
জয়ধ্বনি কর/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল-বোশেখির ঝড়। তিনি কল্পনা করেছেন এক
সাম্যবাদী সমাজের, যেখানে নেই শোষণ, বৈষম্য আর সাম্প্রদায়িক বিভেদ। এতদবিষয়ের
বর্ণনা পাওয়া যায় কবির ‘সাম্যবাদী’ কবিতায়। কবির ভাষায়-গাহি সাম্যের গান, যেখানে আসিয়া এক
হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান, যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রিশ্চান। ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যের ‘শাত-ইল
আরব’, খেয়াপারের তরণী’ ‘কোরবানী’ আগমনী প্রভৃতি কবিতায় যুব সমাজকে বিদ্রোহের পথে
এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান করেন। ‘কামাল পাশা’ ও ‘আনোয়ার’ কবিতায় কবি তারুণ্যকে
অসীম সাহসিকতার ও ত্যাগের মানসিকতা সৃষ্টির দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন। যেমন: আনোয়ার
আনোয়ার/ দিলওয়ার তুমি, জোর তলওয়ার হানো আর/ নেস্ত-ও-নাবুদ কর, মারো যত জানোয়ার। এরপর

‘কোরাবানী’ কবিতায় যুবসমাজকে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ও প্রতিবাদী হওয়ার
আহ্বান জানান। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর ত্যাগ ও সাহসিকতায় উদ্বুদ্ধ হতে আহবান
করেন। কবির ভাষায়- ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন। জোঁর চাই, আর যাচনা নয়/ কোরবানী-দিন
আজ না ওই? সমাজ জীবনে সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে বেঁচে থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি
বিদ্রোহী কণ্ঠে ঘোষণা দিলেন-আমি দুর্বার/ আমি ভেঙে করি সব চুরমার/ আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল/ আমি দ’লে
যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল। নজরুল তাঁর কবিতার মাধ্যমে নারী সমাজের মুক্তি এবং নারী
অধিকারকে প্রাধান্য দিয়েছেন। পুরুষের সমাজ জীবনে নারীর অবদানের কথাও চিত্রিত
করেছেন। কবি তাঁর ‘সাম্যবাদী’ কাব্যের ‘নারী’ নামক কবিতায় বলেছেন,আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী
কোনো ভেদাভেদ নাই/ বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধের তার করিয়াছে
নারী, অর্ধেক তার নর। নারীর অবদানের কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে কবি বলেন- এ বিশ্বে যত ফুটিয়েছে
ফুল, ফলিয়াছে যত ফল/ নারী দিল তাহে রূপ-রস-সূধা-গন্ধ সুনির্মল। পুরুষের জীবনে নারীর ভূমিকার কথা
তিনি বর্ণনা করেছেন এভাবে-দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস, নিশিথে হয়েছ বঁধূ/ পুরুষ এসেছে মরুতৃষা লয়ে নারী
যোগায়েছে মধু।/ শষ্য ক্ষেত্র উর্বর হল, পুরুষ চালান হাল/ নারী সেই মাঠে শষ্যরোপিয়া করিল সুশ্যামল/ নর বাহে হল,
নারী বহে জল, সেই জল মাটি মিশে/ ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে। সমাজে জীবনের নারীর
ত্যাগ ও তিতিক্ষার কথা প্রকাশ করে কবি বলেন- জগতের যত বড় বড় জয়, বড় বড় অভিযান/ মাতা ভগ্নি
বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহান। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সাহিত্যকর্মে নারী-পুরুষকে সমানভাবে
দেখেছেন। তিনি নারীকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠিত হননি। তাঁর মতে, পৃথিবীতে সব
কল্যাণকর অবদানের অধিকারী হচ্ছে নারী। নারী কবিতার মাধ্যমে তিনি নারীর ক্ষমতায়নের
দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে মানবতাকে সবচেয় বড় করে দেখেন।
ধর্মীয় ভেদাভেদ ও পার্থক্য ভুলে তিনি সমাজের মানবতার শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলেছেন। ‘মানুষ’
কবিতায় তিনি বলেন, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,/ নহে কিছু মহীয়ান। ধর্মীয় ও জাতিগত বিভেদ ভুলে
মানবতাকে বিশেষ স্থান দিয়েছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি মনে করেন, মানুষের মাঝে
সাম্য বা মৈত্রী থাকা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কোন অবস্থায় ধর্মীয় অনুভূতির মাধ্যমে
মানবতাকে পরাজিত করা যাবে না। কবি ধর্ম-জাতি ও সম্প্রদায় ভেদাভেদ উপেক্ষা করেন।
তিনি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে
সমাজের সকলকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। কবির ভাষায়- তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব
সকল কালের জ্ঞান/ সকল শাস্ত্রে খুঁজে পাবে সখা, খুলে দেখ নিজ প্রাণ/ তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার/
তোমার হৃদয় বিশ্ব দেউল সকলের দেবতার। ধর্ম বিষয়ে অপব্যাখ্যা ভণ্ড ধর্ম ব্যবসায়ীদের ধর্মের
নামে মনগড়া নিয়ম নীতির বিরুদ্ধে কবির ক্ষোভ প্রকাশ পায় ‘মানুষ’ নামক কবিতায়। কোথা
চেঙ্গিস, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়? ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা দেওয়া দ্বার! খোদার ঘরে কে কপাট
লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা.../ হায়রে ভজনালয়/ তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ডগাহে স্বার্থের জয়। ‘মোহররম’ নামক
কবিতায় ১০ মোহররমে প্রচলিত কুসংস্কার পরিহার করে এ দিনে কারবালা প্রান্তের
হৃদয়বিদারক ঘটনার থেকে শিক্ষা নিয়ে ধর্মীয়ত্যাগে উদ্বুদ্ধ হতে যুবসমাজকে তিনি আহ্বান
জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ফিরে এলো আজ সেই মোহররম মাহিনা/ ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না। তিনি
জীবনকে, সমাজকে আপন আয়নার দেখেছেন আর ছবির মতো করে তুলে এনেছেন তার একের
পর এক কবিতায়। সমাজের সকল অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খলার বিরুদ্ধে নজরুলের সুদৃঢ় অবস্থানের
প্রতিফলন নজরুল তাঁর কবিতায় প্রকাশ করেছেন। তিনি দেশের সংকটময় মুহূর্তে নিজেকে

মানুষের পথ নির্দেশক হিসেবে মাথা উচুঁ করে নেতৃত্ব দানে আহ্বান জানিয়ে সমাজের মানুষের
মধ্যে স্বাধীন চেতনা জাগ্রত করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক।
তিনি ছিলেন সাম্যের কবি। সাম্যবাদী কবি। বাঙালির প্রাণের কবি।

Tag
আরও খবর