শৈলকুপা উপজেলার,পটভূমিশৈলকুপার নামকরণ
ঝিনাইদহ
শৈলকুপা’র নামকরণ কিভাবে হয়েছিল বা নামকরণের উৎস কী, এ সম্বন্ধে উল্লেখযোগ্য দলিল না থাকলেও কিছু জনশ্রুতি, কিংবদন্তী এবং বিভিন্ন প্রকাশনায় উল্লিখিত নিবন্ধ থেকে শৈলকুপা নামকরনের উৎস খুঁজে পাওয়া যায়। সুলতান নাসির উদ্দিনের শাসনামলে শৈলকুপার পূর্বনাম নাসিরাবাদ ছিল বলে অনেকে বলে থাকেন। শৈলকুপার অদূরে হরিহরা নামক গ্রামে একটি প্রাচীন ঢিবির সন্ধান মেলে। এটি মধ্যযুগের হরিহর রাজা নামের একজন শক্তিশালী হিন্দু সামন্ত রাজার বাড়ি ছিল বলে অনুমান করা হয়। তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলে পাঠান বংশীয় এক সেনাপতি সৈন্যসামন্ত নিয়ে পাঠান রাজ্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে শৈলকুপার অদূরে বর্তমানে পাঠানপাড়া নামক স্থানে বসতি নির্মাণ করেন। অতঃপর পাঠান বংশের এক ছেলের সাথে হরিহর রাজার কন্যা শৈলবালার প্রেম হয়। একপর্যায়ে শৈলবালাকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘোড়ায় চড়ে কুমার নদের পাড়ে এসে হাজির হন। রাজা হরিহর মেয়েকে খোঁজার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন এলাকায় লোক-লস্কর পাঠান। রাজার লোকজনের হাতে শৈলবালা তার প্রেমিকসহ ধরা পড়ে। অতঃপর রাজাকে খবর পাঠালে তিনি সৈন্যযোগে কুমার নদের পাড়ে হাজির হন এবং রাগ সংবরণ করতে না পেরে স্বীয় কন্যাকে তরবারি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন। যেস্থানে শৈলবালাকে হত্যা করা হয় সে স্থানটিকে তার নামানুসারে শৈলকুপা নামে লোকজন নামকরণ করেন।
অন্য এক জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, পাঠান শাসনামলে শৈলকুপার উত্তরে হরিহরা গ্রামে হরিশচন্দ্র বা হরিহর নামে এক প্রভাবশালী হিন্দু রাজার বসতি ছিল। বাংলায় তখন পাঠান শাসনকাল চলছিল। এ অঞ্চলের রাজা হরিহরের অত্যাচার ও নির্যাতনের কথা শুনে তাকে পরাস্ত করতে পাঠান সেনাপতি দৌলত খাঁকে সৈন্যসামন্তসহ এ অঞ্চলে প্রেরণ করা হয়। বর্তমানে পাঠানপাড়া নামক স্থানে অবস্থান নেন। পাঠানপাড়া থেকে হরিহরার দূরত্ব ছিল প্রায় ২ মাইল। সেনাপতি দৌলত খাঁ রাজা হরিহরকে প্রথমে বশ্যতা স্বীকার করার জন্য আহবান জানান। কিন্তু রাজা হরিহর এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই যুদ্ধে রাজা পরাস্ত ও নিহত হন। রাজকন্যা শৈলবালা মতান্তরে শৈলদেবীকে পাঠান সৈন্যরা কুমার নদের তীরে আটক করে কুপিয়ে হত্যা করে। সে হতে ‘শৈল’ এবং ‘কুপা’ সংযুক্ত হয়ে শৈলকুপা নামকরণ হয়েছে।
সতীশচন্দ্র মিত্র রচিত যশোর খুলনার ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, প্রাচীনকালে এ অঞ্চল সমুদ্রগর্ভ থেকে দ্বীপের আকারে জেগে উঠেছিল। এর চারিদিকে ছিল অসংখ্য নদ-নদী, খাল-বিল, খাড়ী, জলাভূমি। এসব স্থানে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। মাছের আধিক্যের জন্য মাছের নামানুসারে অনেক স্থান যেমন গজারিয়া, বোয়ালিয়া, পুটিমারি ইত্যাদি এলাকার নামকরণ হয়েছে। অনুরূপভাবে শৈল মাছের প্রাচুর্যের কারণে এলাকাটি শৈল মাছের নামানুযায়ী শৈলমারী, শলুয়া, শালকুপা, শৈলকুপা হয়েছে। শৈলমাছ সাধারণত কুপিয়ে মারা হয়। শৈলমাছের সাথে কুপানো শব্দটি একত্র করে শৈলকুপা নামকরণ হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। ভূতাত্ত্বিক গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এ অঞ্চলের মাটিতে প্রচুর পরিমাণে কংকর, নুড়ি পাথর বা শৈল আছে। প্রাচীনকালে সুপেয় পানির জন্য কূপ বা কুয়া খনন করা হতো। কূপ খননকালে এ অঞ্চলের মাটির অল্প গভীরে নুড়ি জাতীয় পাথর বা শীলা পাওয়া যায় এবং মাটিতে একধরনের কাঁকর বা ঝিল এর আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। শৈল (পাথর) এর সাথে কূপ (কুয়া) সংযোগে এলাকার নামকরণ শৈলকুপা হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।