প্রথমেই জানব ব্ল্যাক বক্স বা কালো বক্স কী?
ব্ল্যাক বক্স হল বিমানের অভ্যন্তরীণ যাবতীয় তথ্য সংরক্ষণের ছোট বক্স। বিমান উড্ডয়ন থেকে অবতরণের যাবতীয় তথ্য এই বক্সে সংরক্ষিত হয়। যা ভবিষৎ তথ্য অনুসন্ধানে ব্যাপকভাবে কাজ করে। ব্ল্যাক বক্স আসলে কোনো বক্স বা বক্সের মত দেখতে না। মূলত ছোট একটি সিলিন্ডারের সাথে প্ল্যাটফর্মের মধ্যে জুড়ে দেয়া একটি ইউনিট, যাতে একটা ব্যাটারী ও একটা মেমোরি কার্ড স্লট সংযুক্ত করা হয়ে থাকে।
ব্ল্যাক বক্স দেখতে কেমন?
ব্ল্যাক বক্সের নামের সাথে এর কাজের কোনো মিল নাই। ব্ল্যাক বক্স নামে কালো হলেও বেশিরভাগ ব্ল্যাক বক্সই কমলা রঙের হয়। এর স্বচ্ছ কারণ কমলা রঙের উজ্জ্বলতা কালো রঙের চেয়ে বেশি যা সহজেই চোখে পড়ে। ফলে উদ্ধার পূর্ববর্তী কাজে ব্ল্যাক বক্সকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়।
এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ব্ল্যাক বক্স কমলা রঙয়ের হওয়া সত্যেও ওরেঞ্জ বক্স নামে না ডেকে ব্ল্যাক বক্স নামেই কেন ডাকা হয়?
এর বেশ কয়েকটি জনশ্রুতি উত্তর আছে,
ব্ল্যাক বক্স আবিষ্কারের শুরুর দিকে এটি কালো রঙের ছিল এবং দূর্ঘটনা বা মৃত্যুর প্রতিক কালো হওয়াই এটি ব্ল্যাক বক্স নামে প্রচলিত হয়েছিল। আবার তৎকালীন সময়ে ধাতব যেকোনো নতুন উদ্ভাবন বা আবিস্কার কালো রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা হত বলে একে ব্ল্যাক বক্স নামে অভিহিত করা হত। যার ফলে ব্ল্যাক বক্স এই নামে প্রচলিত হয়ে বর্তমানে বহাল আছে। যদিও পাইলট বা এভিয়েশন কর্মীরা এই নামে ডাকে না, তাঁরা বরং ব্ল্যাক বক্সকে 'ফ্লাইট রেকর্ডার' নামে ডাকে।
ব্ল্যাক বক্সের বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী?
ব্ল্যাক বক্স একধরনে 'ইলেকট্রনিক ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার'। মানে উড়োজাহাজের অভ্যন্তরীণ একটি ডিভাইস যা আধুনিক বিশ্বের অন্যতম আবিষ্কার। যেখানে উন্নত প্রযুক্তির সুষম ব্যবহার সুনিশ্চিত হয়েছে। ব্ল্যাক বক্স অত্যন্ত মজবুত। এটি শক্ত ধাতব পদার্থ লেথিয়াম, স্টেইনলেস স্টিল ও টাইটানিয়ামের তৈরি। এর উপর কয়েকটি আবরণ স্তর দেয়া থাকে যা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে ঠিকে থাকতে পারে। একটি ব্ল্যাক বক্স কে যদি ঘন্টায় ৭৫০ কিমি গতিতে আছড়ে ফেলা হয় তবুও এটি অক্ষত অবস্থায় থাকতে পারে, স্থির অবস্থায় একটি ব্ল্যাক বক্স ২.২৫ টন ওজন সহ্য করে কমপক্ষে ৫ মিনিট ঠিকে থাকতে পারে, ৬ হাজার মিটার পানির নিচে একটি ব্ল্যাক বক্স অক্ষত অবস্থায় থাকতে পারে এবং ১০০০ ডিগ্রী সেলসিয়াত তাপমাত্রা সহ্য করার ক্ষমতা রাখে।
ব্লাক বক্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এর সেন্সর। যখন এটি পানিরে সংস্পর্শে আসে তখন প্রতি সেকেন্ডে একটি করে সিগন্যাল পাঠায়, যা উদ্ধার তৎপর সহায়ক। ব্ল্যাক বক্স সাধারনত ১ মাস পর্যন্ত সিগন্যাল পাঠাতে পারে তবে তা ব্যাটারী স্হায়ীত্বের উপর কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে। এটি পানির নিচ থেকে সর্বোচ্চ ৪ কিলোমিটার পর্যন্ত সংকেত পাঠাতে পারে। পাইলট,কো-পাইলট,ক্রু ও তার কক্ষের সবার কথাবার্তা বিমান দূর্ঘটনা পতিত হওয়ার ২ ঘন্টা আগের তথ্য অডিও রেকর্ড করে সংরক্ষণ করে রাখতে পারে। যা Solid-State Drive (SSD) স্টোরেজে এসে সংরক্ষিত হয়। সেক্ষেত্রে Solid State Drive না থাকলে ম্যাগনেটিক স্টোরেজে এই তথ্য ৩০ মিনিট পর্যন্ত সংরক্ষণ হতে পারে। আধুনিক ব্ল্যাক বক্সগুলো ২৫ ঘন্টা পর্যন্ত বিমানের ফ্লাইট ডাটা সংরক্ষণ করতে পারে!
ব্ল্যাক বক্স বা 'ই-ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার' কোথায় কাজ করে?
ব্ল্যাক বক্স বা তথ্য রেকর্ডার দুইভাবে তথ্য সংগ্রহ করে কাজ করে।
(১) ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার (এফডিআর)
(২)ককপিট ভয়েস রেকর্ডার(সিভিআর)
✔সিভিআর
সিভিয়ার সাধারনত ককপিট বা বিমানের পিছনে লাগানো থাকে। ককপিট বা বিমানের ভেতর পাইলটদের নিজেদের মধ্যে এবং পাইলটদের ক্রুদের মধ্যে কথাবার্তা, এভিয়েশন কর্মী ও বিমান কন্ট্রোল টাওয়ারের সাথে রেডিও কথাবার্তা, বিমানের অভন্ত্যরীন সংকেত, নড়াচড়া ও গতিবিধি একটি মাইক্রোফোনে রেকর্ড করে এসোসিয়েটড কন্ট্রোল ইউনিট নামক ডিভাইসের মাধ্যমে সংরক্ষিত করে। যা পরবর্তীতে ব্ল্যাক বক্সে গিয়ে জমা হয়।
✔এফডিআর
এফডিআর ককপিট বা বিমানের পারিপার্শ্বিক অবস্তা সম্পর্কে তথ্য জমা রাখে। বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ, বিমানের অভ্যন্তরীন তাপমাত্রা, বিমানের উচ্চতা এবং চারপাশে চাপের তারতাম্যের তথ্য-উপাত্ত রেকর্ড করে রাখে। এর জন্য অনেকগুলো চিপসেট বা মেমোরি ব্যবহার করা হয়। যেগুলো বিমানের বিভিন্ন জায়গায় লাগানো সেন্সরের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ হয়ে ফ্লাইট ডাটা অ্যাকুইজিশন ইউনিটে মাধ্যমে ব্ল্যাক বক্সে গিয়ে জমা হয়।
ব্ল্যাক বক্সের উপকারিতাগুলো কী কী?
ব্ল্যাক বক্স, দূর্ঘটনায় পতিত হওয়া বিমানের ধ্বংসাবশেষ, দূর্ঘটনার কারন সম্পর্কে সঠিক ও সুনিশ্চিত তথ্য পেতে এবং বিমানের অবস্তান শনাক্তে যথাযথ কাজ করে। বিমান উড্ডয়ন হতে অবতরণ অবধি যাবতীয় তথ্য ব্ল্যাক বক্সে সংরক্ষিত থাকে যা আকস্মিক বিমান দূর্ঘটনা পরবর্তী উদ্ধারকাজ সম্পন্ন করার জন্য ব্যবহৃত হয়। তথ্য উদ্বার পরবর্তী কাজ হিসেবে বিধ্বস্ত বিমানের ব্ল্যাক বক্স থেকে তথ্য উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত তথ্য ব্ল্যাক বক্সের স্টোরেজ থেকে সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট সফটওয়্যার ও যন্ত্রের সাহায্যে বিধ্বস্ত বিমানের দূর্ঘটনাকবলিত কারণ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করা হয়। তবে,এইসব তথ্য উদ্ধার করতে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসও লেগে যায়।
ব্ল্যাক বক্স আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়াই অদূর ভবিষ্যতে অডিও রেকর্ডিং এর পাশাপাশি High-Definition ভিডিও ধারন করতে সম্মত হবে। এছাড়াও রেকর্ড করা সকল তথ্য যাতে ভূমির কন্ট্রোল টাওয়ারে সরাসরি চলে যায় সে ব্যাপারেও কাজ করা হচ্ছে। যার ফলে ব্ল্যাক বক্সের সংরক্ষিত তথ্যের জন্য বিধ্বস্ত বিমান উদ্ধার করতে আর অপেক্ষা করতে হবে না। বিশেষজ্ঞ দল কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের সাহায্যে এইসব কাজ করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
৫ দিন ১৪ ঘন্টা ২১ মিনিট আগে
৮ দিন ২৩ ঘন্টা ৪৫ মিনিট আগে
১১ দিন ৭ ঘন্টা ১৯ মিনিট আগে
১৩ দিন ১৩ ঘন্টা ৪ মিনিট আগে
৩৩ দিন ১৮ ঘন্টা ৯ মিনিট আগে
৪৩ দিন ১৬ ঘন্টা ৪১ মিনিট আগে
৪৮ দিন ১৪ ঘন্টা ৪১ মিনিট আগে
৫৯ দিন ২২ ঘন্টা ০ মিনিট আগে