◾মু. ইমন হোসেন : বর্তমান প্রজন্ম একযোগে দুটি জগতে বাস করছে, তাহলো বাস্তব এবং ভার্চুয়াল। গবেষণায় দেখা গেছে, তারা ক্রমেই ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় দিচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত হয়ে পড়ছে। দুই দশক আগেও টেলিভিশনকে বলা হতো 'ব্রেইন রট' বা 'মস্তিষ্ক পচন'র প্রধান আধেয়। যার জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে ইন্টারনেট সংযোগসহ একটি সহজলভ্য স্মার্টফোন। যা ক্রমাগত পচিয়ে দিচ্ছে নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতা ও উদ্যমকে। ধ্বংস করে দিচ্ছে উদ্ভাবনী শক্তি। চলুন জেনে নেওয়া যাক ব্রেন রট বা মস্তিষ্কের পচন বিষয়টা আসলে কি? ব্রেইন রটস কোনো চিকিৎসা-পরিভাষার শব্দ নয বরং এক সামাজিক বাস্তবতা, যার মুখোমুখি হচ্ছে আজকের প্রজন্ম। এই শব্দটি দ্বারা মানুষের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিস্থিতির অবনতি বোঝায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অকারণে সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়ে থাকে এবং তাদের মধ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় শর্টস, রিলস দেখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। একে বলা হয় ডুমসক্রোলিং। আর এই ডুমসক্রোলিং এর ফলাফলই হলো 'ব্রেন রট' বা 'মস্তিষ্কের পচন'।
এই ব্রেইন রটের ফলাফল যে কত ভয়ংকর আর তা থেকে মুক্তির উপায়ই বা কি? ব্রেইন রটসের প্রভাব সরাসরি পড়ছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে। মনোযোগের সময়কাল কমে যাচ্ছে, স্মরণশক্তি দুর্বল হচ্ছে, সৃজনশীল চিন্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। বাস্তব জীবনের কাজগুলো কষ্টকর মনে হচ্ছে, কারণ ভার্চুয়াল জগত আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে, সবকিছু হোক “তাৎক্ষণিক”। এতে করে কর্মজীবনে দক্ষতা কমছে, পড়াশোনায় আগ্রহ হারাচ্ছে শিক্ষার্থীরা এবং সার্বিকভাবে সমাজে তৈরি হচ্ছে মানসিক অবসন্নতার এক ধোঁয়াটে আবহ। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, আমরা ধীরে ধীরে নিজেদের চিন্তাশক্তির উপর আস্থা হারিয়ে ফেলছি। তবে সমাধান আছে, তা শুরু করতে হবে নিজ থেকেই। প্রথমত, দরকার সচেতনতা, নিজেকে জিজ্ঞেস করা, ‘আমি কতটুকু সময় স্ক্রিনে কাটাচ্ছি, আর তা থেকে আমি কী পাচ্ছি?’ প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা, নির্দিষ্ট সময়ে ফোন বন্ধ রাখা; এসব ছোট ছোট পদক্ষেপেই পরিবর্তন সম্ভব। দ্বিতীয়ত, মননশীল বই পড়া, ডকুমেন্টারি দেখা বা শিক্ষামূলক ভিডিও দেখার মাধ্যমে মানসম্পন্ন কনটেন্ট গ্রহণ করা। তৃতীয়ত, নির্দিষ্ট সময় ধরে একাগ্রচিত্তে কাজ করা ও মাঝেমধ্যে গভীর চিন্তা বা লেখালেখির চর্চা করা অর্থাৎ ডিপ ওয়ার্ক এর অভ্যাস গড়ে তোলা।
চর্তুথত, প্রতিদিন অন্তত একজন কাছের মানুষের সঙ্গে “ডিজিটাল ছাড়া” কিছু সময় কাটান, চোখে চোখ রেখে কথা বলুন, হাঁটুন, গল্প করুন, চুপচাপ বসেও থাকুন। এই নির্ভেজাল সংযোগ মস্তিষ্ককে প্রশান্ত করে, বিষণ্ণতা দূর করে অর্থাৎ পরিবার - প্রতিবেশীদের সাথে সময় কাটানো যেতে পারে। পঞ্চমত, প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানো, শরীরচর্চা, মেডিটেশন ইত্যাদি স্বাস্থ্যের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে। সবশেষে এক কথায়, মানসিক বিপ্লব বা সবকিছুর মূলে আছে আত্ম-শৃঙ্খলা।
স্মরণ রাখা দরকার, মস্তিষ্ক একটি বাগানের মতো, যদি সেখানে প্রতিনিয়ত আগাছা ঢোকানো হয়, একদিন সব ফলপ্রসূ গাছই মরে যাবে। আমাদের উচিত সেই বাগানে যত্নের জল ঢালা, গঠনমূলক চিন্তা রোপণ করা এবং অপ্রয়োজনীয় কনটেন্টের আগ্রাসন থেকে দূরে থাকা। প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অংশ, তবে সেটি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়। আমাদের উচিত প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা নিজের মস্তিষ্ককে জাগ্রত করতে, নিঃশেষ করতে নয়।
বাংলাদেশে জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল জেন-জি ও জেন-আলফা প্রজন্মের। তরুণ, সতেজ, সক্রিয় ও সংবেদনশীল এই শক্তিকে 'মস্তিষ্ক পচন' থেকে রক্ষা করতে হবে। এ দায়িত্ব একজন অভিভাবক, শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা, আমলা, উপদেষ্টা সবার। এই দায়িত্ব পালনে সবাই ব্যর্থ হলে সমাজে অবধারিতভাবে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। যার কিছু আলামত এখনই দৃশ্যমান, যেমন কিশোর অপরাধ ইত্যাদি প্রকট হওয়া।
মু. ইমন হোসেন
লেখক ও সংগঠক
৭ দিন ১০ ঘন্টা ১ মিনিট আগে
৯ দিন ১৯ ঘন্টা ১৭ মিনিট আগে
১০ দিন ১৫ ঘন্টা ৩১ মিনিট আগে
১০ দিন ২২ ঘন্টা ৪৬ মিনিট আগে
১১ দিন ১২ ঘন্টা ৩৬ মিনিট আগে
১৪ দিন ২৩ ঘন্টা ৩ মিনিট আগে
১৯ দিন ১০ ঘন্টা ৪ মিনিট আগে