ঈদের ছুটির রেশ কাটতে না কাটতেই কর্মব্যস্ত যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে টাঙ্গাইলের মধুপুরের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ভিড় জমিয়েছেন হাজারো দর্শনার্থী। সবুজ অরণ্য, লাল মাটির উঁচু-নিচু টিলা আর আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা দেখতে ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকেই প্রকৃতিপ্রেমীদের স্রোত নেমেছে মধুপুর শালবনে। ইট-পাথরের কোলাহল ছেড়ে একটু শান্তির খোঁজে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের এই কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে স্থানীয় পর্যটন স্পটগুলো।
মধুপুর গড়ের প্রাণকেন্দ্র হলো মধুপুর জাতীয় উদ্যান (National Park)। শাল, গজারি আর বিচিত্র লতাগুল্মে ঘেরা এই বনে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। বনের ভেতরে অবস্থিত জলছত্র, দোখলা রেস্ট হাউস এবং রসুলপুর বন বিভাগের গেটগুলোতে দর্শনার্থীদের লম্বা লাইন দেখা গেছে। পরিবারের ছোট-বড় সবাইকে নিয়ে গাড়িবহর করে মানুষ বনের ভেতরে প্রবেশ করছেন।
বনের গহীন নিস্তব্ধতা উপভোগ করার পাশাপাশি বানর ও হনুমানের লাফালাফি শিশুদের বাড়তি আনন্দ দিচ্ছে। বনের ভেতরে ওয়াচ টাওয়ার এবং বসার জায়গাগুলোতে দর্শনার্থীরা আড্ডা ও সেলফি তোলায় মেতে উঠেছেন। ঢাকা থেকে পরিবারসহ আসা বেসরকারি চাকুরিজীবী সুভ্র বলেন, "ঈদের ছুটিতে বাচ্চাদের একটু প্রকৃতির ছোঁয়া দিতে মধুপুর নিয়ে এসেছি। এখানে সবুজ বনের স্নিগ্ধতা শহরের সব ক্লান্তি দূর করে দেয়।"
মধুপুর বনের অন্যতম আকর্ষণ হলো লহড়িয়া হরিণ প্রজনন কেন্দ্র। ঈদের পর থেকে এখানে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বেষ্টনীর ভেতরে দলবেঁধে চড়ে বেড়ানো চিত্রা হরিণ দেখতে দর্শনার্থীরা উপচে পড়ছেন। বিশেষ করে শিশুরা খাঁচার বাইরে থেকে হরিণকে ঘাস বা পাতা খাওয়াতে পেরে দারুণ উচ্ছ্বসিত। পর্যটকদের এই বাড়তি চাপের কারণে বন বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
মধুপুরের পীরগাছা এলাকার বিশাল রাবার বাগান পর্যটকদের আরেকটি প্রিয় গন্তব্য। সারিবদ্ধ রাবার গাছের মাঝ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কিংবা বাইক নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি পেতে তরুণ-তরুণীরা এখানে ভিড় জমাচ্ছেন। এছাড়াও লাল মাটির টিলায় আনারস, সুমিষ্ট কলা এবং মাল্টার বাগানগুলোও দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করছে। গ্রামীণ মেঠো পথ ধরে কৃষির এই আধুনিক রূপ দেখতে অনেক কৃষিপ্রেমী মধুপুরের প্রান্তিক অঞ্চলে ছুটে যাচ্ছেন।
মধুপুরের ঐতিহ্যবাহী গারো ও কোচ সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যময় জীবনযাপন দেখতেও অনেক গবেষক ও দর্শনার্থী গারো পল্লীগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাটির তৈরি ঘর, ঐতিহ্যবাহী পোশাক পর্যটকদের মুগ্ধ করছে। দর্শনার্থীরা স্থানীয় আদিবাসী বাজারগুলো থেকে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী নানা সামগ্রী কিনছেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
ঈদের এই বাড়তি পর্যটকের চাপ মধুপুরের স্থানীয় অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণসঞ্চার করেছে। স্থানীয় খাবার হোটেল, হস্তশিল্পের দোকান, অটোরিকশা ও সিএনজি চালকদের আয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। রসুলপুর মোড় থেকে শুরু করে বনের ভেতরের ছোট দোকানগুলোতে বেচাবিক্রি ছিল জমজমাট।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সারা বছর ব্যবসা চললেও ঈদের ছুটির এই কয়েকদিনের বিক্রি তাদের সারা বছরের লোকসান পুষিয়ে দেয়। তবে অতিরিক্ত পর্যটকের চাপের কারণে কিছু অব্যবস্থাপনার অভিযোগও করেছেন অনেকে। বনের ভেতরে প্লাস্টিকের বোতল ও চিপসের প্যাকেট ফেলে পরিবেশ দূষণ করার প্রবণতা দেখা গেছে। সচেতন পর্যটকরা মনে করেন, বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পর্যটকদের আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।
নিরাপত্তা ও বন বিভাগের তৎপরতা ক্ষেত্রে-দর্শনার্থীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে মধুপুর থানা পুলিশ এবং বন বিভাগের নিরাপত্তা প্রহরীরা বেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। বনের ভেতরে যাতে কোনো ছিনতাই বা ইভটিজিংয়ের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য টহল জোরদার করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের বনের গভীরে একা না যাওয়ার এবং পশুপাখিদের বিরক্ত না করার জন্য মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।
মধুপুর গড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সবসময়ই পর্যটকদের টানে। একটু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে পারলে টাঙ্গাইলের এই মধুপুর গড় হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম শীর্ষ পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র (Eco-tourism Spot)। ঈদের এই উপচেপড়া ভিড় প্রমাণ করে, মানুষ এখনো ইট-কাঠের খাঁচা থেকে বেরিয়ে মাটির কাছাকাছি ফিরতে ভালোবাসে।
৪ ঘন্টা ৫৪ মিনিট আগে
৫ ঘন্টা ১১ মিনিট আগে
৫ ঘন্টা ৫৮ মিনিট আগে
৬ ঘন্টা ৪৭ মিনিট আগে
৬ ঘন্টা ৪৮ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ১৬ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ২৬ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ২৭ মিনিট আগে