জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশে ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। বিশেষত, দেশের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেনারেশন জেড (Gen Z), তাদের সাহসী ও সৃজনশীল আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ব এবং প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদে এই প্রজন্মের তরুণরা আজ শুধু অংশগ্রহণই নয়, এক নতুন ভাষা ও মাধ্যম সৃষ্টি করেছে দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে যেভাবে গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়, তার পেছনে ছিল নানা ধরনের সামাজিক অবিচার, সরকারি দমন-পীড়ন এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা। তরুণরা অনুভব করছিল এক নতুন ধরনের চাপে, যেখানে তাঁদের দাবিগুলোর প্রতিফলন এবং ন্যায্যতা প্রাপ্তির প্রয়োজনীয়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। এই সংকটের মধ্যে, জেন জেড তরুণরা যে আন্দোলনটির সূচনা করেছিল, তা ছিল ব্যতিক্রমী দেওয়াল লিখন এবং গ্রাফিতি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ২৯ জুলাই সারাদেশে গ্রাফিতি কর্মসূচি ঘোষণা করে। ছাত্রছাত্রীরা, বিশেষত স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নামে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে তারা নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে, সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে একত্রিত হয়ে, দেয়াল লিখন এবং গ্রাফিতি আঁকার মাধ্যমে তাদের প্রতিবাদ প্রকাশ করে। পুলিশের আতঙ্ক, স্বৈরাচারের দোসর ছাত্র সংগঠনের হামলা এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর শঙ্কা নিয়েও তরুণরা তাদের দৃঢ়তা হারায়নি।
যদিও দেয়াল লিখন এবং গ্রাফিতি বাংলাদেশের সামাজিক প্রতিবাদের ইতিহাসে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, এর গুরুত্ব এবং প্রভাব তাও চরম। দেয়ালগুলো হয়ে ওঠে তরুণদের ক্ষোভ ও দাবির প্ল্যাটফর্ম, যেখানে তারা সামাজিক ন্যায্যতা, মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের পক্ষে স্লোগান এবং চিত্র অঙ্কন করে। এই কাজগুলি শুধু শৈল্পিক নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিবাদের মাধ্যমও হয়ে ওঠে। "স্বাধীনতা" ও "সামাজিক ন্যায্যতা" এই ধরনের স্লোগানগুলো দেয়ালগুলোর গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়, যেখানে গণতান্ত্রিক অধিকার এবং মানবাধিকারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
এ আন্দোলনের একটি বিশেষ দিক হলো তরুণদের সৃজনশীলতা এবং সাহসিকতা। যারা গ্রাফিতি আঁকছিল, তারা শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদই জানাচ্ছিল না, সমাজের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করার এক নতুন ভাষাও তৈরি করছিল। তারা জানতো, তাদের এই কাজের মাধ্যমে কেবল সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা নয়, বরং দেশের ভবিষ্যতকে একটি নতুন দিশা দেখানো হচ্ছে। এই গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখন তরুণদের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক চেতনা সৃষ্টি করেছিল, যা রাষ্ট্রীয় স্তরের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হওয়ার আহ্বান ছিল।
গ্রাফিতি কর্মসূচির প্রতিক্রিয়া হিসেবে সরকার ও তার প্রশাসনিক বাহিনী নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয়। পুলিশি হস্তক্ষেপ, ছাত্র সংগঠনগুলোর হামলা, এবং অন্যান্য বাধার সম্মুখীন হলেও, তরুণরা তাদের প্রতিবাদের ধারা থামাতে পারেনি। তারা জানতো, তাদের প্রতিটি স্কেচ, প্রতিটি স্লোগান এবং প্রতিটি আঙ্কিত চিত্র শুধু তাদের নিজের জন্য নয়, দেশ ও জাতির জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দেয়।
দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতির এই আন্দোলন এক ধরনের সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করেছে। এতে নতুন প্রজন্মের তরুণরা সরকারের প্রতি তাদের হতাশা, ক্ষোভ এবং প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে। তারা জানে, বাংলাদেশের ভবিষ্যত তাদের হাতে, এবং তাদের এই সৃজনশীল প্রতিবাদ ও সামাজিক সচেতনতায় দেশের রাজনীতি ও সমাজের নানা অবিচার থেকে মুক্তির পথ খুঁজে বের করা সম্ভব।
জুলাই ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী সময়কাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, যেখানে তরুণরা তাদের সৃজনশীলতার মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করেছে। দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি আজকের দিনের সচেতন, সাহসী এবং দায়িত্বশীল প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের জেন জেড প্রজন্মের তরুণরা এক নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তারা তাদের শৈল্পিক ভাষা এবং প্রতিবাদের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যত তৈরি করবে।
১১ দিন ২৩ ঘন্টা ২১ মিনিট আগে
১২ দিন ২৩ ঘন্টা ৩ মিনিট আগে
১৪ দিন ১২ ঘন্টা ৪২ মিনিট আগে
১৫ দিন ১৪ ঘন্টা ১০ মিনিট আগে
১৬ দিন ২৩ ঘন্টা ২ মিনিট আগে
২১ দিন ২ ঘন্টা ৪৬ মিনিট আগে
২১ দিন ৯ ঘন্টা ৭ মিনিট আগে
২১ দিন ১২ ঘন্টা ৩৩ মিনিট আগে