গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের জেরে জামালপুরের বকশীগঞ্জের সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিম হত্যাকাণ্ডের একবছর পূর্তি হলো আজ। স্থানীয় আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনের পদধারী কতিপয় বিপদগ্রামী নেতাদের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে ২০২৩ সালের ১৫ জুন আজকের এই দিনে
হাসপাতালে চিকিৎসা অবস্থায় সাংবাদিক নাদিম মারা যান। ঘটনার এক বছরেও আদালতে সাংবাদিক নাদিম হত্যা মামলার প্রতিবেদন দাখিল করেনি পুলিশ। বিপরীতে এই দীর্ঘ সময়ে নানা অঘটনার ঘনঘটা বিরাজ করছে। প্রথমে হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিতর্ক মন্তব্য, পরে পর্যায়ক্রমে থানা-পুলিশের রহস্যজনক ভূমিকা, মামলার তদন্ত কর্মকর্তার প্রধান আসামির জবানবন্দি নিয়ে মিথ্যাচার, এজাহারভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তার না করাসহ নানা অঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। নাদিম হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই বকশীগঞ্জে সাংবাদিক রনি, মতিন, মাসুদ, ছালাসহ বেশকয়েকজন হামলার শিকারসহ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
উপজেলায় বস্তুনিষ্ঠু সাংবাদিকতা এনিয়ে শঙ্কিত সাংবাদিক সমাজ।
জানা যায়, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকমের জামালপুর জেলা প্রতিনিধি এবং একাত্তর টেলিভিশন ও মানবজমিন পত্রিকার বকশীগঞ্জ সংবাদদাতা সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিম গত বছরের ১৪ জুন হামলার শিকার হয়ে ময়মনসিংহ হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া অবস্থায় পরদিন ১৫ জুন মারা যায়। ঘটনার ৪ দিন পর ১৮ জুন সাংবাদিক নাদিমের স্ত্রী মনিরা বেগম বাদী হয়ে ২২ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২০-২৫ জনের বিরুদ্ধে বকশীগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। তবে মামলা দায়েরের আগে ওইদিন ভোরে হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি চেয়ারম্যান এজাহার নামনীয় আসামি মাহমুদুল আলম বাবু, জাকিরুল ও মনিরুলকে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রামের একটি বাড়ি থেকে এবং রেজাউলকে বগুড়া থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকায় নিয়ে যায় র্যাব। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ৭ নম্বর আসামি একমাত্র গোলাম কিবরিয়া সুমন। এছাড়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে পুলিশ কফিল, ফজলু মিয়া, শহী, মকবুল, ওহিদুজ্জামান, তোফাজ্জল ও আইনাল নামে ৮ জনকে গ্রেপ্তার করে ৪ দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করলে জামিন নামঞ্জুর করে বিচারক তাদের কারাগারে প্রেরণের আদেশ দেন। পরে পর্যায়ক্রমে তারা জামিনে বের হয়ে আসে। ৫ দিনের রিমান্ড শেষে প্রধান আসামি বাবু চেয়ারম্যানকে পুলিশ আদালতে সোর্পদ করলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠায়।
মামলার এজাহার নামনীয় ২২ আসামির মধ্যে ৪ আসামিকে র্যাব গ্রেপ্তার করে থানায় সোপর্দ করলেও এখন পর্যন্ত মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছে পুলিশ। তবে মামলা দায়েরের আগেই ৮ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। কিন্তু পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ওই ৮ জনকে কারাগারে পাঠানো হলেও তাদেরকে মামলায় আসামি করা হয়নি। নাদিমের গ্রামের বাড়িতে সার্বিক খোঁজখবর নিতে গিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ ন্যায় বিচারের আশ্বাস দিলেও এখনো এজাহারভুক্ত আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।
যে কারণে নাদিম হত্যাকাণ্ডে শিকার :
প্রায় ১০ বছর আগে প্রথম স্ত্রীর বিনা অনুমতিতে সাবিনা আক্তার নামে এক নারীকে গোপনে বিয়ে করে চেয়ারম্যান বাবু। ২০১৮ সালে তাঁকে তালাক দেয়। আদালতে মামলা করলে সেবার ফিরিয়ে নেয়। তবে ছয় মাস বয়সী মেয়েসন্তানসহ আগের মতোই বাবু তার স্ত্রীকে বাসায় একা রাখে। এক পর্যায়ে স্ত্রী সাবিনাকে অস্বীকার করে বাবু। এনিয়ে ওই বছরের ১০ মে ‘দুইবার বিয়ের পরও সন্তান-স্ত্রীকে অস্বীকার করছেন ইউপি চেয়ারম্যান!’, ১৪ মে ‘আমি আমার স্বামী চাই, একসঙ্গে সংসার করতে চাই’ এবং ২০ মে ‘আ.লীগ থেকে স্বামীর বহিষ্কার চেয়ে স্ত্রীর আবেদন’ শিরোনামে পৃথক পৃথক খবর করেন নাদিম। এতে ক্ষিপ্ত হন বাবু চেয়ারম্যান। একের পর এক খবর প্রকাশ করায় নাদিমসহ কয়েকজনের নামে সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন বাবু। কিন্তু তা খারিজ করে দেন ময়মনসিংহের সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক। আর ওই মামলা খারিজের চার ঘণ্টার মধ্যেই হামলার শিকার হন নাদিম।
যেভাবে মারা হয় : সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে প্রথমেই নাদিমকে মোটরসাইকেল থেকে টেনে নামিয়ে মারধর করে। পরে আরও ৮- ১০ জন দৌড়ে এসে মারধরে অংশ নেয়। একপর্যায়ে তাঁকে অন্ধকারে নিয়ে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়।
নাদিমের বাড়িতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান : ঘটনার ৬দিন পর ২০ জুন উপজেলার নীলাখিয়া ইউনিয়নের গোমেরচর গ্রামে সাংবাদিক নাদিমের বাড়িতে তাঁর পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নিতে যান জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ। এসময় তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামিদের আইনের আওতায় আনাসহ হত্যাকাণ্ডের ন্যায় বিচারের আশ্বাস দেন।
যেসব আসামি অধরা : ইউপি চেয়ারম্যান বাবুর ছেলে এহাজার নামনীয় আসামি ফাহিম ফয়সাল রিফাত, আমর আলী মেম্বার এবং সুরুজ এখনও অধরা।
নাদিম হত্যার দায় স্বীকারোক্তি নিয়ে মিথ্যেচার :
৫ দিনের রিমান্ড শেষে ২৩ জুন জামালপুর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালতে ১৬৪ ধারায় প্রধান আসামি চেয়ারম্যান বাবু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন মর্মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির তৎকালীন ওসি আরমান আলী বাদীপক্ষের আইনজীবীকে জানালেও পরবর্তীকে সেটা মিথ্যে প্রামাণিত হয়। এনিয়ে ১৩ সেপ্টেম্বর বাবু চেয়ারম্যানের পুনরায় রিমান্ড ও তার ছেলে রিফাতের গ্রেপ্তার দাবি করে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিক নাদিমের পরিবারের সদস্যরা অনশনে বসেলেও কাজ হয়নি।
ওসির ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ : বকশীগঞ্জ থানার তৎকালীন ওসি সোহেল রানার ভূমিকা হত্যাকারীদের পক্ষাশ্রিত হওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তা থেকে প্রত্যাহারসহ
ওসিকেও মামলায় সম্পৃক্ত করার দাবি জানান নাদিমের স্বজনসহ স্থানীয় সাংবাদিকেরা। ওই বছরের ২৩ জুন জামালপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি হাফিজ রায়হান সাদার সভাপতিত্বে জামালপুর প্রেসক্লাব আয়োজিত সাংবাদিক নাদিম স্মরণে শোকসভা ও দোয়া মাহফিলে এনম দাবি করেন সাংবাদিক তাঁরা। অভিযুক্ত সোহেল রানা বর্তামানে জেলার ডিবি-২ শাখায় ওসি পদে কর্মরত।
এসপির বিতর্কৃত বক্তব্য : একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাতকারে জামালপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) নাছির উদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, সাংবাদিক নাদিমকে আঘাত কিংবা হত্যা করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং সতর্ক করার জন্য হামলা করা হয়েছিল। এনিয়ে এসপির প্রত্যাহার দাবি করেছিলেন সাংবাদিকেরা।
বকশীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি এম শাহীন আল আমীন বলেন, সব আসামি দ্রুত গ্রেপ্তার না হলে মামলার বিচার কার্যক্রমে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। তাই দ্রুত বিচারের স্বার্থে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করা জরুরি। এ উপজেলায় সাংবাদিক নির্যাতন থামেনি।'
নিহত সাংবাদিক নাদিমের মেয়ে রাব্বিলাতুল জান্নাত বলেন, 'এজাহার নামনীয় মাত্র একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে ৩ আসামি। দীর্ঘ সময়েও আসামিদের গ্রেপ্তার না করায় হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে শঙ্কা হচ্ছে।'
সাংবাদিক নাদিম হত্যা মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী ইউসুফ আলী বলেন, 'মামলাটি প্রথমে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি। জেলখানায় আটক রয়েছে প্রধান আসামি চেয়ারম্যান বাবুসহ এমডি রাকিব, স্বপন মণ্ডল, শেখ ফরিদ, সোলাইমান এবং শামীম খন্দকার। ম্যাজিস্ট্রেটের রুম থেকে বের হয়ে তদন্ত কর্মকর্তা আমাদের বলেছিলেন, আসামি বাবু নিজেকে জড়িয়ে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। কিন্তু এটি মিথ্যাচার ছিল। পরবর্তীতে জানতে পারি, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত মর্মে একটি শব্দও বলেননি বাবু।'
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও জামালপুর ক্রিমিনাল ইনভেসটিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) পুলিশের পরিদর্শক গোলাম কিবরিয়া বলেন, 'এজাহারভুক্ত ৩ আসামি পলাতক রয়েছে। মামলার তদন্তকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।'
২২ ঘন্টা ৫৬ মিনিট আগে
৫ দিন ৪ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে
১০ দিন ২৮ মিনিট আগে
১২ দিন ২২ ঘন্টা ৩০ মিনিট আগে
১৩ দিন ২৩ ঘন্টা ৯ মিনিট আগে
১৪ দিন ৯ ঘন্টা ২৫ মিনিট আগে
১৪ দিন ৯ ঘন্টা ২৫ মিনিট আগে
১৭ দিন ১২ ঘন্টা ৫৮ মিনিট আগে