প্রকল্পের কাজ শুরু না করা এবং নির্ধারিত কর্মদিবসে প্রকল্পে কাজে শ্রমিক না থাকায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে নানা মহলে নানাবিধ প্রশ্নের দানা বাঁধছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অতিদরিদ্রদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের গৃহীত ইজিপিপি প্রকল্প যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় দারিদ্র সীমার নিচে থাকা অতিদরিদ্র শ্রমিকরা একদিকে অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অপরদিকে বিধি মোতাবেক প্রকল্পে নিয়োগ না দেওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়েছে অতিদরিদ্র শ্রমিকরা। অবস্থা এমন যে সরকারি বরাদ্দকৃত ইজিপিপি প্রকল্পের অর্থ যেনো 'লুটপাটের আয়োজন' চলছে।
উপজেলা প্রকল্প কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় স্বাভাবিকভাবে কায়িক পরিশ্রম অক্ষম অতিদরিদ্র শ্রমিকদের মাথাপিছু ৪০০ টাকা দৈনিক মজুরিতে ইজিপিপি প্রকল্পের মাটি কাটার কাজ করানোর কথা প্রকল্পের কার্যাদেশে রয়েছে।
১১০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্পে দ্বিতীয় পর্যায়ে নোয়ারপাড়া ইউনিয়নে ৯টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এতে ২৭৮ জন সুবিধাভোগী শ্রমিকের বিপরীতে ১ কোটি ২২ লাখ ৩২ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। অবকাঠামো উন্নয়নে মাটি কাটার কাজ করার কথা রয়েছে।
গত ৪ ফেব্রুয়ারি একযোগে প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু করার সরকারিভাবে নির্দেশনা দেয়া হয়। প্রকল্পে তদারকিতে রয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান। সাধারণ সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্যগণ প্রকল্পের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ের দেখভালে দায়িত্বে রয়েছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. নুরনবী মোস্তফা চৌধুরী। অর্থনৈতিক সুরক্ষার সার্বিক তত্বাবধান ও উপজেলা ইজিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।
রোববার (১৯ ফেব্রয়ারি) সরেজমিনে দেখা যায়, ইউনিয়নের সোনামুখি শাজাহান মেম্বারের দক্ষিণ বাড়ি থেকে সোনামুখি ঈদগাঁ মাঠ পর্যন্ত রাস্তা মেরামত প্রকল্পে নামমাত্র শুরু হলেও এদিন কোনো শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়নি।
এ প্রকল্পের সভাপতি ইউপির ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শাজাহান শেখ সাজ বলেন, 'আজ শ্রমিক নিইনি। পরে কাজ করবো।'
উলিয়া হরমুজের দোকান থেকে আছাদ চেয়ারম্যানের বাড়ি জামে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা মেরামত প্রকল্পে মাটি কাটতে শ্রমিক পাওয়া যায়নি।
প্রকল্পের সভাপতি ইউপির ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সুরুজ্জামান বলেন, 'মাটি পাওয়া যাচ্ছে না। পরে কাজ করা হবে।'
রামভদ্রা বাজার থেকে রামভদ্রা শাহীন মণ্ডলের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত প্রকল্পে মাটি কাটার কাজ শুরুও করা হয়নি।
এ প্রকল্পের সভাপতি ইউপির ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য উসমান গনি সিনা বাবু বলেন, 'ইউপি চেয়ারম্যান সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ শুরু করবো।'
নোয়ারপাড়া নজরুল ইসলামের বাড়ি থেকে নোয়ারপাড়া আকালু প্রমানিকের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত প্রকল্পের শুরু করা হয়নি।
প্রকল্পের সভাপতি ইউপির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সমসের মণ্ডল বলেন, 'কাজ কখন শুরু করা হবে, সেটা ইউপি চেয়ারম্যান সাহেব বলতে পারবেন। আমি নামেমাত্র প্রকল্পের সভাপতি।'
এছাড়া ব্রহ্মত্তোর ফারুকের দোকান থেকে বাহাদুরের মোড় থেকে ব্রহ্মত্তোর গিয়াস শেখের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত, হাড়গিলা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মাটি ভরাট, কাজলা আলেকের বাড়ি থেকে পরি ধরা বাধের চার রাস্তা মোড় পর্যন্ত রাস্তা মেরামত, কাঠমা জনতা বাজার পাকা রাস্তা থেকে জহুদ আলীর বাড়ির দক্ষিণ পাশে উঁচু রাস্তা পর্যন্ত রাস্তা মেরামত এবং মাইজ বাড়ি মোন্তাস সোনারের বাড়ি পাকা রাস্তা থেকে নদীপাড় হয়ে সাইফুলের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত প্রকল্পেও কোনো শ্রমিককে মাটি কাটতে দেখা যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা বাবুল, সুজন, বিলকিস বেগম, আকবরসহ অনেকেই বলেন, 'অতিদরিদ্র মানুষের জন্য সরকার অর্থনৈতিক সুরক্ষায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে মাটি কাটার কাজ বরাদ্দ দিলেও ইউপির চেয়ারম্যান-মেম্বারেরা তা বাস্তবায়ন না করে সরকারি অর্থ লুটপাটের আয়োজন করছে।'
নোয়ারপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রোমান হাসান বলেন, 'প্রকল্পের কাজে শ্রমিক না থাকার বিষয়টি আমার জানা নেই। নিয়মানুযায়ী প্রকল্পের কাজ করতে প্রকল্পের স্ব-স্ব সভাপতিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবো।'
প্রকল্প বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. নুরনবী মোস্তফা চৌধুরী বলেন, 'প্রকল্পের কাজ শুরু না করার বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজখবর নিয়ে জানবো।'
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মু. তানভীর হাসান রুমান বলেন 'যেসব প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়নি, সেসব প্রকল্পের সভাপতিরা এখন কাজ শুরু করবে। কাজ না করলে, বিল দেওয়া হবে না।'
উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এসএম জামাল আব্দুন নাছের বাবুল বলেন, 'প্রকল্পের কাজ কখন কোথায় কীভাবে শুরু করা হবে, সেটা আমাকে জানানো হয়নি। কাজ না করার বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে খোঁজখবর নেবো।'