বারইয়ারহাটে আল-আবরার হজ্ব কাফেলার ওমরা কনফারেন্স শেরপুরে বিনা লাইসেন্সে পশুখাদ্য উৎপাদন, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা লক্ষ্মীপুর নজরুলের আগমনের শতবর্ষে জেলা সাহিত্য সংসদের প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ মিরসরাইয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের মাসিক সমন্বয় সভা কুল্যা টু বাঁকা সড়ক মরণফাঁদে পরিণত দ্রুত সংস্কারের দাবি চন্দনাইশে বেশি দামে ইউরিয়া সার বিক্রি, ডিলারকে জরিমানা লাখাইয়ে পবিত্র জসনে জুলুস ঈদে মিলাদুন্নবী (স) উদযাপিত। ৪টার পর ক্যাম্পাসে অবস্থান নিষিদ্ধ, শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন ‘কলেজ নাকি কিন্ডারগার্টেন?’ পবিপ্রবিতে র‍্যাগিং: ১৩ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তি, দুজন হল থেকে বহিষ্কার এল আর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে মতবিনিময় সভা শ্যামনগরে দরিদ্র নারীদের মাঝে ছাগল বিতরণ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট উপলক্ষে শেরপুরে প্রস্তুতিমূলক সভা ‎সুন্দরবনে বনদস্যু ‘বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী’র তাণ্ডব: ট্রলারসহ ৫ জেলে অপহৃত জাবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতির নির্বাচন ৩০ আগস্ট, তফসিল ঘোষণা লালপুরে স্যালোচালিত গাড়ির ধাক্কায় ইজিবাইক চালক নিহত, চালক আটক ঈশ্বরগঞ্জে অবৈধভাবে সার মজুদ রাখায় একজনের কারাদন্ড দুইজনের ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা *টেকনাফে র‌্যাবের পৃথক দুইটি অভিযানের একটিতে পরিত্যক্ত অবস্থায় বিদেশী এসএমজি উদ্ধার এবং অপর অভিযানে ৩২৭ রাউন্ড তাজা গুলিসহ নারী আটক* চন্দনাইশে প্রশাসনের লোক পরিচয়ে অস্ত্রের মুখে ২৩ লাখ টাকার ডাকাতি চিলমারীতে "ফ্রেন্ডশিপ (FDIDP) প্রজেক্টের স্টাফ ও সমাজ সেবার" যৌথভাবে (CBR) এপ্রোচ মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। যশোর জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের অভয়নগর ইউনিটের অফিস উদ্বোধন

সোনাইমুড়িতে ২ বছর পর কঙ্কাল উদ্ধার

নিখোঁজের আড়ালে ছিল জোড়া হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমঃ সম্পত্তির জন্য সৎ মা ও ভাইকে হত্যা, ০২ বছর পর সিআইডি কর্তৃক রহস্য উদঘাটন


২০১২ সালের কোনো এক সময়, জীবনের নানা দুঃখ-কষ্ট পেরিয়ে বিধবা কমলা খাতুন নতুন করে সংসার জীবনে পা রাখেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন বিপত্নীক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে। দু’জনেরই এটি ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। অতীতের বেদনা ভুলে তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন শান্তি ও ভালোবাসার একটি ছোট সংসারের।


সেই সংসারকে আরও পরিপূর্ণ করে জন্ম নেয় তাদের পুত্র সন্তান নোমান। অন্যদিকে আবুল কালাম আজাদের প্রথম পক্ষের সংসারে ছিল পাঁচ ছেলে, যাদের মধ্যে তিনজন এখন জীবিত। সময়ের সাথে সাথে বড় হতে থাকে পরিবারটি। সৎ সন্তান, তাদের স্ত্রী-সন্তান এবং নিজের সন্তানকে নিয়ে কমলা খাতুন ধীরে ধীরে একটি বড় পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন।


প্রায় সাত-আট বছর আগে আবুল কালাম আজাদের মৃত্যু হলে সংসারের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পরও কমলা খাতুন তার একমাত্র ছেলে নোমান এবং সৎ সন্তানদের সঙ্গে একই বাড়িতে শান্তিপূর্ণভাবেই বসবাস করছিলেন। বাহ্যিকভাবে সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হতো।


কিন্তু হঠাৎ করেই বদলে যায় সবকিছু। ২০২৪ সালের ১০ মার্চ, ভিকটিমের সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, ৯ মার্চ থেকে তাদের সৎ মা নিখোঁজ রয়েছেন এবং মোবাইল ফোনেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।


এ খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ছুটে আসেন কমলা খাতুনের ছোট বোন রহিমা বেগম। তিনি এসে সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর ও সাইফুল ইসলাম রাজন রাজুকে তার বোন সম্পর্কে  জিজ্ঞাসা করলে তারাও কমলা খাতুনকে খুঁজে পাচ্ছেন না বলে জানান। তারা রহিমা বেগমকে বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে এ বিষয়ে তারা থানায় জিডিও করা হয়েছে বলে তথ্য দেন।


কিন্তু রহিমা বেগম তাদের কথায় পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেননি। তার মনে জন্ম নেয় গভীর সন্দেহ। বোনের হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তিনি কোনো স্বাভাবিকতা খুঁজে পাননি। অবশেষে তিনি নিজেই বাদী হয়ে ১৪ মার্চ ২০২৪ তারিখে নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। সেখানে (০১) সাগর(৩৫), (০২) রাজু (৩০), (০৩) শ্যামলী (৪৫) ও (০৪) কাজল (৩৮) নামীয় ০৪ জনকে সন্দেহভাজন বিবাদী করা হয়।


ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় বিজ্ঞ আদালত প্রথমে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), নোয়াখালীকে অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন। পরে আরও গভীর অনুসন্ধানের জন্য মামলাটি সিআইডি নোয়াখালীকে হস্তান্তর করা হয়।


এরপর শুরু হয় সন্তানসহ এক নিখোঁজ নারীর রহস্য উদ্ঘাটনের দীর্ঘ অনুসন্ধান। প্রায় তিন মাস ধরে নানা অনুসন্ধান, তথ্য সংগ্রহ ও সন্দেহভাজনদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পর অবশেষে ২০২৪ সালের ৪ জুন সিআইডির অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত সোনাইমুড়ি থানায় একটি নিয়মিত মামলা রুজু করার নির্দেশ দেন। মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩) এর ৭/৩০ ধারায় রুজু হয় এবং তদন্তভার দেওয়া হয় সিআইডিকে।


অনুসন্ধান থেকে অপহরণ মামলা রুজু ও তদন্ত কার্যক্রমঃ


এবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় অপহরণ মামলার তদন্ত কার্যক্রম। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে সিআইডি গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়। জানা যায়, মৃত্যুর আগে আবুল কালাম আজাদ তার দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা খাতুন এবং তাদের একমাত্র শিশু সন্তান নোমানের নামে বসতবাড়িসহ সংলগ্ন প্রায় ৩০ শতাংশ জমি লিখে দিয়েছিলেন। বর্তমান বাজারমূল্যে যার মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। এই সম্পত্তিকে কেন্দ্র করেই দীর্ঘদিন ধরে প্রথম সংসারের সন্তানদের সঙ্গে বিরোধ চলে আসছিল।


বিশেষ করে এজাহারভুক্ত অভিযুক্ত জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর বিদেশ থেকে দেশে ফিরে সম্পত্তি নিজেদের নামে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য কমলা খাতুনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে একটি জমি বিক্রির অর্থের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়েও সৎমা ও সৎ সন্তানদের মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দেয়।


তদন্তে আরও উঠে আসে, ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে অভিযুক্তরা কমলা খাতুন ও তার শিশু ছেলে নোমানকে মারধর করে এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয়। সেই ঘটনার পর থেকেই মা ও ছেলেকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে ভিকটিম কমলা খাতুনের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন সিআইডি জনৈক এক ব্যবহারকারী কাছ থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ব্যবহারকারীকে  জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, মোবাইল ফোনটি ঢাকার সবুজবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে ভাঙারি মালামালের সঙ্গে বিক্রি করা হয়েছিল। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে সিআইডি ওই বাসা এবং এর ভাড়াটিয়াদের তথ্য বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে।


তদন্তে তখন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। সিআইডি জানতে পারে, মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সাইফুল ইসলাম রাজন রাজু একসময় ওই বাসাতেই ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন।


আসামী গ্রেফতার ও খুনের লোমহর্ষক তথ্য প্রাপ্তিঃ


দীর্ঘ তদন্ত ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অবশেষে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে। সিআইডি নোয়াখালীর একটি চৌকস আভিযানিক দল এলআইসি, সিআইডির সহায়তায় গোপন তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ২১ মে রাতে ময়মনসিংহের কোতোয়ালী থানার ভাটিকাশর এলাকা থেকে এজাহারভুক্ত আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে রাজন ওরফে রাজু (৪০)-কে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।


গ্রেফতারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন, ২২ মে সন্ধ্যায়, সোনাইমুড়ী জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে আরেক এজাহারভুক্ত আসামি জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর (৪৫) এবং তদন্তে উঠে আসা সহযোগী অভিযুক্ত আশিকুর রহমান টিপু (৩২)-কে গ্রেফতার করা হয়।


পরবর্তীতে আদালতের অনুমতিতে তিন দিনের রিমান্ডে এনে তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে এক ভয়াবহ ও শিউরে ওঠার মতো হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা।


জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা স্বীকার করে যে, সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে ঘটনার প্রায় পনেরো দিন আগেই তারা হত্যার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে আগেই একটি গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়, যাতে হত্যার পর লাশ গোপনে মাটিচাপা দেওয়া যায়।


পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাতে কমলা খাতুন ও তার শিশু ছেলে নোমানের খাবারের পানির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। গভীর রাতে তারা অচেতন হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে অভিযুক্তরা ঘরে প্রবেশ করে। এরপর গলায় গামছা পেঁচিয়ে, হাত দিয়ে গলা চেপে এবং বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে মা ও শিশুপুত্রকে হত্যা করা হয়।


হত্যার পর অপরাধের কোনো চিহ্ন যাতে না থাকে, সেজন্য তারা ভিকটিমদের পরনের কাপড় খুলে ফেলে এবং পূর্বপ্রস্তুত জায়গায় লাশ দুটি পুঁতে রাখে। পরে ব্যবহৃত গামছা ও পরিধেয় কাপড় আগুনে পুড়িয়ে ফেলে আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়।


গ্রেফতারকৃত আসামীদের দেওয়া তথ্যমতে পুকুর সেচ ও দেহাবশেষ উদ্ধারঃ 


তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২৪/০৫/২০২৬ খ্রি. সকালে সিআইডির একটি দল স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে সন্দিগ্ধ পুকুর সেচে ও ভেকুর সাহায্যে খনন করে ও লুকিয়ে রাখা দেহাবশেষ উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে।  ভিকটিম কমলা খাতুন ও শিশু নোমানের দেহাবশেষ উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত দেহাবশেষের সুরতহাল প্রস্তুতপূর্বক ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয় এবং পরবর্তীতে আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে দেহাবশেষ ভিকটিমদের স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হয়।


গ্রেফতারকৃত আসামীদের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানঃ


গ্রেফতারকৃত ০৩ জন অভিযুক্ত বিজ্ঞ আদালতে ফৌঃকাঃবিঃ ১৬৪ ধারায় নিজ দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে।  দেহাবশেষ থেকে সংগৃহীত নমুনা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।  


বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে সিআইডি, নোয়াখালী ইউনিট। এ ঘটনায় জড়িত অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তথ্য উদঘাটন ও অন্যান্য অভিযুক্তদের গ্রেফতার করার স্বার্থে সিআইডির তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

আরও খবর