◾ডা. উজ্জ্বল কুমার রায়
ডেঙ্গু জ্বর বা ডেঙ্গি একটা ভাইরাসঘটিত রোগ। এটা খুব সাধারণ রোগ হলেও হেমারেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম অবস্থায় প্রায়ই রোগীর মৃত্যু হয়। মরণব্যাধির জন্য ডেঙ্গুর ওপর সরকারের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়-সিটি করপোরেশন-পৌরসভা) নজরদারি বেড়েছে।
√ রোগের বিস্তার :
বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কায় এ রোগ বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশে এ রোগের উপস্থিতি বহুদিনের এবং প্রায়ই মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা শহরে এ রোগের মহামারি দেখা যাচ্ছে। শহর বা শহরতলি এলাকায় এবং গ্রামাঞ্চলেও এ রোগ দেখা যাচ্ছে। বর্ষাকালে মশা বাড়লে রোগ বেশি ছড়ায়। শীতকালে এ রোগ দেখা যায় না।
√ রোগের কারণ :
ডেঙ্গু ভাইরাসঘটিত রোগ। এর চার রকম উপজাতি আছে। ডেন-ওয়ান, টু, থ্রি এবং ফোর।
√ কীভাবে ছড়ায় :
এডিস মশা ডেঙ্গু রোগের বাহক। আক্রান্ত মানুষের রক্ত খেয়ে মশা আক্রান্ত হয়। আবার মানুষকে এ মশা কামড়ালে সুস্থ মানুষ আক্রান্ত হয়।
√ সুপ্তিকাল :
সাধারণত পাঁচ-সাত দিন। কিন্তু এটা তিন থেকে ১০ দিনও হতে পারে।
√ উপসর্গ :
হঠাৎ জ্বর, হাড়ের মধ্যে ব্যথা, গাঁটে ব্যথা, গলা ব্যথা, খিদে কমে যাওয়া, চামড়া লালচে ভাব হওয়া ও চুলকানো। কারও কারও ক্ষেত্রে প্রথমে দুই-তিন দিনের মধ্যে চামড়ায় লালচে ভাব এবং ছয় দিনের মাথায় শরীরে লাল রঙের গোটাও বেরোয়। কম ক্ষেত্রে নাক ও মাড়িতে রক্তক্ষরণ হয়। গা-হাত-পা ব্যথা, মাথা ব্যথা, পেট ব্যথা, জিব বিস্বাদ, পায়খানার রং কালো হওয়া কিংবা গন্ডগোল।
√ ডেঙ্গু হেমারেজিক ফিভার বা রক্তক্ষরণকারী ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গ :
জ্বর, মাথা ব্যথা, গায়ে ব্যথা, খিদে কমে যাওয়া এসব উপসর্গ দিয়ে শুরু হলেও শরীরের বিভিন্ন অংশে বিশেষত উপরিভাগে ছোট ছোট লাল বা কালচে দাগ বেরোয়। নাক, মাড়ি, খাদ্যনালি, প্রস্রাবে রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা থাকলেও তা বেশ কম। যকৃৎ ও লসিকাগ্রন্থি বড় হতে দেখা যায়। কখনো কখনো এ রোগে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়, যা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে পৌঁছাতে পারে।
√ ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের উপসর্গ :
রক্তনালি থেকে রক্তের প্লাজমা-রস বেরিয়ে যাওয়ার ফলে রক্তের আয়তন এবং রক্তচাপ খুব কমে যায়। রোগীর দেহ খুব ঠান্ডা হয়ে যায় এবং মৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা থাকে। হঠাৎ রক্তচাপ অতিরিক্ত কমে যাওয়া এবং রক্তে অণুচক্রিকার সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত কমে যাওয়া অথবা রক্তের ঘনত্ব ২০ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়া দেখে এ অবস্থা নির্ণয় করা হয়।
√ রোগ নির্ণয় :
সঠিকভাবে ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় করতে হলে রক্তে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি দেখা হয়। মনে রাখতে হবে পাঁচ দিন জ্বরের আগে এ পরীক্ষা কার্যকর ফল দেয় না। আইজিজি পরীক্ষা না করে কেবল আইজিএম পরীক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত। এলিজা পদ্ধতিতে আইজিএম এবং আইজিজি পরীক্ষায় প্রাথমিক বা দ্বিতীয় সংক্রমণ বোঝা যায়। ম্যাক এলিজা নতুন ও উন্নত পরীক্ষা। এতে নির্দিষ্টকরণ করে বলা যায় ডেঙ্গু সংক্রমণ হয়েছে কি না। এনএস ওয়ান পরীক্ষায় দুই দিনের মধ্যেই রোগের উপস্থিতি জানা যায়। তবে এটি একশ ভাগ নিশ্চিত পরীক্ষা নয়। ভাইরাস কালচার ও আরটি-পিসিআর ব্যয়সাপেক্ষ পরীক্ষা। সাধারণত করা হয় না। রক্তে অণুচক্রিকার সংখ্যা মাপা জরুরি।
√ চিকিৎসা :
ডেঙ্গুজ্বরে কেবল প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করতে হয়। অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ হিতে বিপরীত হয়। রক্তক্ষরণের কোনো চিহ্ন থাকলে বা অণুচক্রিকা কমে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে অণুচক্রী ইনজেকশন দিতে হয়। এটি স্যালাইন মারফত শিরার মধ্যে দেওয়া হয়। আচ্ছন্ন অবস্থায় (শক সিনড্রোম) বা অস্বাভাবিক রক্তচাপ কমে গেলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে বিশেষ চিকিৎসার দরকার। সে ক্ষেত্রে স্যালাইন, ডেক্সট্রান বা রক্ত দেওয়া হয়।
√ খাদ্য :
সাধারণত স্বাভাবিক খাদ্য খেতে হয়।
√ রোগ প্রতিরোধ :
ডেঙ্গু জ্বরের বাহক মশা ‘এডিস’-এর বংশবৃদ্ধির ওপর কড়া নজরদারি দরকার। বড় মশা ও মশার লার্ভা মারার জন্য ডিডিটি ও ম্যালাথিয়ন স্প্রে করা, ফেলে দেওয়া বা পরিষ্কার রাখা দরকার। ফ্রিজের পেছনে, ফেলে রাখা টায়ার প্রভৃতি জায়গার কৃত্রিম জলে এডিস মশা ডিম পাড়ে।
বর্তমানে গ্রামেগঞ্জে কলাপাতার ফাঁকেও জমা পানিতে এদের বংশবৃদ্ধি করতে দেখা যায়। এ জায়গাগুলোয় বিশেষ নজর দিতে হয়। ব্যক্তিগত সচেতনতা খুব জরুরি। এডিস মশা দিনের বেলা বেশি কামড়ায়। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের শরীর ঢাকা জামাকাপড় পরতে ও ওডোমস জাতীয় ক্রিম ব্যবহার করতে বলা হয় মহামারির সময়। পরিবেশ ও বাসাবাড়ি-ঘরদোর পরিষ্কার রাখা এবং অবশ্যই মশারি খাটিয়ে শোয়া উচিত।
√ টিকা :
এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর টিকা তৈরি হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে টিকার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
লেখক : মেডিসিন ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট, গ্লোবাল স্পেশালাইজড হাসপাতাল
১১ দিন ১৪ ঘন্টা ১৯ মিনিট আগে
১৫ দিন ৩ ঘন্টা ৩০ মিনিট আগে
১৮ দিন ১ ঘন্টা ৪৮ মিনিট আগে
২১ দিন ২ ঘন্টা ৫৮ মিনিট আগে
৩৩ দিন ১৫ ঘন্টা ২৯ মিনিট আগে
৪৩ দিন ৬ ঘন্টা ২ মিনিট আগে
৪৭ দিন ১৭ ঘন্টা ৩৮ মিনিট আগে
৫৯ দিন ১১ ঘন্টা ২০ মিনিট আগে