◾ মোঃ আল-আমিন ফরাজী
গীবত আরবি শব্দ যার আভিধানিক অর্থ পরনিন্দা করা, কুৎসা রটানো, পেছনে সমালোচনা করা, পরচর্চা করা, দোষারোপ করা, কারও অনুপস্থিতিতে তার দোষ অন্যের সামনে তুলে ধরা। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে খুবই জগন্য ও নিন্দনীয় কাজ। যাকে হারাম ও কবিরা গুনাহ বলা হয়ে থাকে । যা থেকে বিরত থাকতে ইসলামে কঠোর ভাবে আদেশ করা হয়েছে। গীবতের প্রতি সতর্ক করে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ ‘ তোমাদের কেউ যেন একে অপরের গীবত বা পরনিন্দা না করে। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাক। ’ (সুরা-৪৯ হুজুরাত, আয়াত: ১২)। অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘ দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে। অবশ্যই তারা হুতামাতে (জাহান্নামে) নিক্ষিপ্ত হবে। ’ (সুরা- হুমাজা,)। এর ভয়াবহতা সম্পর্কে আর রাসূল (সাঃ) বলেনঃ ‘পরনিন্দাকারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারী ও মুসলিম)। রাসূল (সাঃ) আরো বলেনঃ ‘গীবত জিনার চাইতেও মারাত্মক।’ (মেশকাত)
ইসলাম একটি শান্তির ধর্ম। যেখানে কোনো বিশৃঙ্খল কিংবা অন্যায়ের স্থান নেই। ইসলামে মদ্যপান, চুরি, ডাকাতি, ব্যভিচার ইত্যাদি যেমনি ভাবে মারাত্মক ও নিকৃষ্টতম পাপ ও কবিরা গুনাহ , ঠিক তেমনি ভাবে গীবতও জগন্য অপরাধ। অন্যান্য গুনাহ তওবা দ্বারা মাফ হয়। কিন্তু গীবত বা পরনিন্দা এমন গুনা যা একটি তওবা দ্বারা মাফ হয় না। সে যার গীবত করেছে সে যদি মাফ করে তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ তাআলা তাকে মাফ করবেন। একটি কবিরা গুনাহই জাহান্নামে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে একটু চিন্তা করলে আমরা বুঝতে সক্ষম হবো যে , গীবত বা পরনিন্দা থেকে তৈরি হয় বিভিন্ন সামাজিক এবং জাতীয় সমস্যা। সম্পর্কের মাঝে বিভিন্ন টানাপোড়ন আরো কত কি। তাছাড়া, গীবত বা পরনিন্দা ইসলামি দৃষ্টি কোন থেকে সম্পূর্ণ হারাম ও বর্জনীয়। কারো দোষ বা ত্রুটি অন্যের কাছে বলা ও শোনা সমান অপরাধ । কেউ যদি অন্যের দোষ আপনার কাছে বর্ননা করে তাহলে আপনি তাকে আল্লাহর ভয় দেখিয়ে সতর্ক করতে পারেন । আর যদি তা আপনার পক্ষে সম্ভব না হয় ,তাহলে আপনি সে স্থান ত্যাগ করে চলে আসার চেষ্টা করুন ।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ( সা ) বলেছেন, ‘তোমরা কি জানো গীবত কাকে বলা হয়? সাহাবীগন বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা) ভালো জানেন। তিনি বললেন গীবত হল তোমার কোনো ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে, তা-ই হল গীবত। সাহাবায়ে কেরাম রাঃ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) আমি যদি এমন দোষের কথা বলি যা তার মাঝে বৃদ্ধমান তাও কি গীবত হবে? উত্তরে রাসুল (সা) বললেন, তুমি যে দোষের কথা বললে তা যদি তোমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে, তবে তুমি অবশ্যই গীবত করলে। আর তুমি যা বলতেছ তা যদি তার মধ্যে না থাকে, তবে তুমি তার উপর তোহমত বা বুহতান তথা মিথ্যা অপবাদ আরোপ করলে। (মুসলিম)। ’ আর যদি কেউ কারও উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে, তাহলে ইসলামি শরিয়তে তাকে ৮০ টি ব্যত্রাগাত করা করা হবে। আর মিথ্যা আরোপ কারীগন হল ফাসিক, পাপী, অপরাধী। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে এই শ্রেণির লোকের সাক্ষী গ্রহন করা হবে না। সে কারো কাছে বিশ্বাস ভাজন হবে পারে না। কেউ তাকে বিশ্বাস বা নির্ভর করে না। সে সকালের কাছে অপমানের পাত্র। সবাই তাকে অন্তর থেকে ঘৃনা করে যদিও মুখে প্রকাশ করে না। সব চাইতে বড় কথা হল ইসলামি আদালতে তার দেওয়া সাক্ষ্য গ্রহন করা হয় না। রাসূলুল্লাহ্ (সা:)-এর নিকটে আয়েশা (রা) ছাফিইয়া (রা:)-এর সমালোচনা করতে গিয়ে বলেনঃ হে আল্লাহ্র রাসূল (সা:) আপনার জন্য ছাফিইয়ার এরকম এরকম হওয়াই যথেষ্ট। এর দ্বারা তিনি ছাফিইয়্যার বেঁটে সাইজ বুঝাতে চেয়েছিলেন। এতদশ্রবণে নাবী কারীম (সা:) বললেনঃ “হে আয়েশা! তুমি এমন কথা বললে, যদি তা সাগরের পানির সঙ্গে মিশানো যেত তবে তার রং তা বদলে দিত।” হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, “তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন আমাকে মিরাজে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন আমাকে তামার নখবিশিষ্ট একদল লোকের পাশ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। তারা তাদের নখগুলো দিয়ে নিজ মুখমণ্ডলে ও বক্ষদেশে আঘাত করে ক্ষতবিক্ষত করছিল। আমি জিবরাইল কে জিজ্ঞাসা করলাম এরা কারা? জিবরাইল (আ.) বললেন, এরা দুনিয়াতে মানুষের গোশত ভক্ষণ করত এবং তাদের মানসম্মান নষ্ট করত। অর্থাৎ তারা মানুষের গীবত ও দুষ- চর্চা করত।” (আবু দাউদ ৪৮৭৮)।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, “রাসুলে করিম (সা) বলেছেন, দুনিয়াতে যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করবে, অর্থাৎ গীবত করবে, কিয়ামতের দিন তাদের কে পচা-দুর্গন্ধ যুক্ত মাংস ভক্ষণ করতে বাধ্য করা হবে। অতঃপর সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও চিৎকার করতে করতে তা ভক্ষণ করবে।” (বুখারি) কোন এক সফরে রাসূলুল্লাহ্ ( সাঃ) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ তিনি থমকে দাঁড়ালেন এবং বললেন, এই দুই কবরবাসীকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। তবে তাদেরকে তেমন বড় কোনো অপরাধে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না (যা থেকে বেঁচে থাকা তাদের জন্য কঠিন ছিল)। এদের একজনকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, অন্যের গীবত বা নিন্দা করার কারণে এবং অন্যজনকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে প্রস্রাব থেকে বিরত না থাকার কারণে। ( প্রস্রাবের ছিটা থেকে নিজে কে হেফাজত করত না ( মুসলিম ,আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ৩৪৯)
মুখের মাধ্যমে অন্যের দোষ চর্চা করাকে যেমনি ভাবে গীবত বলা হয়, ঠিক তেমনি ভাবে অন্যন্যা অঙ্গ পতঙ্গের মাধ্যমে অন্যের দোষ চর্চা করা কেও গীবত বলা হয়। যেমনঃ চোখের মাধ্যমে, কানের মাধ্যমে, লেখা লেখির মাধ্যমে, অন্য যে কোন উপায়ে অন্যের দুষ বর্ননা কারা করা।
পরিশেষে, একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করতে ইসলামী শরীয়তের বিধি নিষেধ মেনে চলা জরুরি। ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে গীবত বা পরনিন্দা খুবই জগন্য বা নিকৃষ্ট কাজ। যা থেকে বিরত বা হেফাজত থাকতে কুরআন-হাদীছে কঠোর ভাবে আদেশ করা হয়েছে। তা থেকে বিরত থাকা প্রতিটি মুসলমানদের ঈমানী দায়িত্ব ও কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল কে এই জগন্য গুনাহের কাজ থেকে হেফাজত করুন। ( আমীন)।
৪ দিন ৫ ঘন্টা ৫২ মিনিট আগে
৪ দিন ২২ ঘন্টা ৫৩ মিনিট আগে
৫ দিন ৫৪ মিনিট আগে
৫ দিন ১০ ঘন্টা ২৯ মিনিট আগে
৬ দিন ৮ ঘন্টা ১৬ মিনিট আগে
৬ দিন ২২ ঘন্টা ৪৯ মিনিট আগে
৭ দিন ২০ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে
১২ দিন ২০ ঘন্টা ৫৬ মিনিট আগে