চা বাগানে চলছে 'ইরিগেশন'
মৌলভীবাজারে টানা তাপদাহে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে জনজীবন। এর প্রচণ্ড প্রভাব পড়েছে চা-সমৃদ্ধ জেলার চা শিল্পেও। তীব্র তাপদাহে পুড়ছে বিভিন্ন চা বাগান। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় বাগানের চারা গাছ মরে যাচ্ছে। দেখা দিচ্ছে নানা রোগবালাই। তাপে ঝলসে যাচ্ছে গাছের কচি পাতা। বিশাল সবুজের সমারোহ এখন কালচে লাল। কুঁকড়ে বিবর্ণ হয়ে পড়েছে কুঁড়ি। টানা গরমের প্রভাব ও বৃষ্টি না হওয়ায় কমে এসেছে উৎপাদন। চা পাতা উত্তোলনের ভরা মৌসুমে নতুন পাতা আর কুঁড়ি না আসায় চা শ্রমিকরাও নির্ধারিত পরিমাণ চা পাতা সংগ্রহ করতে পারছেন না।
মৌলভীবাজার জেলার ৯২টি চা বাগানের সিংহভাগ বাগানের একই পরিস্থিতি। এতে চা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন মৌসুমের শুরুতেই চা-শিল্প প্রতিকূলতার মুখে পড়ায় কমে যাচ্ছে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা।
জেলার শ্রীমঙ্গল, রাজনগর ও কমলগঞ্জের বিভিন্ন চা বাগান সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, তীব্র তাপদাহে নতুন সৃজিত চা-এর ৩০ শতাংশ চারাগাছ ও ১০ শতাংশ পুরাতন চা-গাছ পুড়ে গেছে। এছাড়া নতুন আসা কুঁড়ি গুলো কোথাও দুই সপ্তাহ ধরে একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে। কোথাও কোথাও কুঁড়িগুলো হলুদ রং ধরেছে। কোথাও আবার পাতা ঝিমিয়ে পড়েছে। এই সময়ে নতুন কুঁড়িতে ভরে থাকার কথা থাকলেও খুব কম চাবাগানেই চা গাছের সবুজ কুঁড়ি দেখা গেছে। নতুন পাতা আর কুঁড়ি না আসায় চা শ্রমিকরাও নির্ধারিত পরিমাণ চা পাতা সংগ্রহ করতে পারছেন না। সহসা চায়ের জন্য পরিমিত বৃষ্টি না পেলে দেখা দিতে পারে উৎপাদন ঘাটতি। এ অবস্থায় চায়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে বিকল্প ইরিগেশন দিয়ে চা গাছকে প্রাণবন্ত রাখার চেষ্টা করছেন চা বাগান কর্তৃপক্ষ।
আলাপকালে চা শ্রমিকরা জানান, দুটি পাতা একটি কুঁড়িতে বৃষ্টির পরিবর্তে কৃত্রিম পানি সরবরাহের যে উৎসগুলো ব্যবহার হয় সেই লেক, পাহাড়ি ছড়াগুলোতেও নেমে গেছে পানির স্তর। তাপমাত্রার কারণে পোকামাকড় বেড়েছে। নতুন পাতা না আসায় অনেক কষ্ট করে বাগানে ঘুরে ঘুরে চা পাতা উত্তোলন করছেন তারা। ফলে মৌসুমের শুরুতে অর্ধেকের কম উৎপাদন হচ্ছে চা বাগানে।
শ্রীমঙ্গলের ভুড়ভুড়িয়া চা বাগানের কর্মরত শ্রমিক সারথী দেশওয়ারার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বৃষ্টি না থাকার কারণে এই সময়ে সারা দিনে মাত্র ১০-২০ কেজি পর্যন্ত চা পাতা তুলতে পারছি। অথচ বৃষ্টি থাকলে আমরা এসময়ে সারা দিনে ৩০ থেকে ৪০ কেজি পাতা তুলতে পারতাম।
কমলগঞ্জের চা শ্রমিক সরদার কান্তা ভর জানান, প্রচন্ড রোদে সারাদিন কাজ করেও তাদের শ্রমিকরা মিলাতে পারছেন না হাজিরা।
শ্রীমঙ্গলের ভুড়ভুড়িয়া চা বাগানের মহিস রিকিয়াশন বলেন, বৃষ্টি না থাকার কারণে চা বাগানগুলো পুড়ে গেছে, অনেক চা পাতার রং নষ্ট হয়ে গেছে। সকালে ও বিকেলে অনেক চা বাগানে কলস দিয়েও প্রচুর পানি দিয়েছি, আবার মেশিন কম থাকার কারণে বাগানে পানি কভার দেওয়া সম্ভব হয় না।
রাজনগের চা শ্রমিক জোনাকি বলেন, আগে দৈনিক ৩০ থেকে ৪০ কেজি চা পাতা একাই তুলছি। এখন সারাদিনে ১৫ কেজি চা পাতা তুলতে পারি না। বাগানে পাতাই নাই। বাগান ঘুরে পাতা তোলা লাগে। এক জায়গায় বেশি পাতা থাকে না বৃষ্টি না হলে কষ্ট দূর হবে না।
শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগানের শ্রমিক সর্দার উজ্জ্বল হাজরা বলেন, চা বাগানে গরমের কারণে কাজ করা অনেক কষ্ট। রোদের কারণে একটু কাজ করেই শ্রমিকরা ক্লান্ত হয়ে যান। চা শ্রমিক নেতা দীপংকর ঘোষ বলেন, খরায় বেশি পাতা তোলা যাচ্ছে না। শ্রমিকরা আগে যে পরিমাণ পাতা তুলতেন, এখন তার অর্ধেক পাতা তুলেছেন তারা। প্রতিকূল আবহাওয়ায় চা উৎপাদনে দুর্দিন চলছে।
চা বাগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সময়মতো বৃষ্টি না হলে ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মূলত অনাবৃষ্টির সঙ্গে তীব্র তাপদাহেএমন অবস্থা। চা বাগানের জন্য যেমন ভারী বর্ষণ দরকার, তা এখনও হয়নি। সেচের পানি বেশি দিতে হচ্ছে বাগানগুলোতে। এতে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কায় আছেন তারা।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার ফুলবাড়ি চা বাগানের ব্যবস্থাপক আনিসুর রহমান বলেন, টানা তাপদাহে চা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং নানা রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ছে। বাগানগুলোতে সদ্য লাগানো চারাগাছ মরে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।
বাংলাদেশ টি এস্টেট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রহমান বলেন, বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এখন কোনও উৎপাদন নেই বললেই চলে। তবে দু-একটি বাগানে পাতা চয়ন শুরু হয়েছে।
ন্যাশনাল টি কোম্পানির (এনটিসি) মাধবপুর চা-বাগানের ব্যবস্থাপক দিপন কুমার সিংহ বলেন, এখন চা-পাতা উত্তোলনের ভরা মৌসুম। কিন্ত যে পরিমাণ পাতা চয়ন করার কথা সেভাবে হচ্ছে না। চায়ের জন্য পরিমিত বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। যদি বৃষ্টি হয় তাহলে স্বাভাবিক হবে গাছগুলো।
চা-বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের সিলেট অঞ্চলের চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ শিবলী বলেন, এবার মৌসুমের প্রথম দিক থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে না। বৃষ্টি না হওয়ায় ছাঁটাই করা গাছগুলোতে নতুন পাতা আসছে না। পানির সংকটে নতুন কুঁড়ি আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এজন্য গাছ পুড়ে যাচ্ছে চা গাছ। এখন বৃষ্টি না এলে বাগানের ক্ষতির শঙ্কা বেশি।
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান বলেন, এই সময়ে চা অঞ্চলে ১৫ থেকে ২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। গত বছরের মার্চ মাসে ৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। অথচ চলতি বছরের মার্চে এসে মাত্র ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। শুধু তাই নয়, গেলো পাঁচ মাসে এই অঞ্চলে কোনও বৃষ্টিপাত হয়নি। জেলার সবকটি চা বাগান তাপদাহের কবলে পড়েছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিটের পরিচালক ড. এ কে এম রফিকুল হক বলেন, জেলার কিছু বাগানে চলতি মৌসুমে চা পাতা উত্তোলন শুরু হলেও টানা তাপদাহে প্রচণ্ড প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন চা বাগানে। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়া ও তাপামাত্রা বেশি থাকায় চা গাছ খাদ্য তৈরি করতে পারছে না। এ কারণে চায়ের কুঁড়ি বের হচ্ছে না। এ পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জনে চা বাগানে সমন্বিত পদ্ধতি মেনে চলা, চা গাছের গোড়ায় কচুরিপানা-লতাপাতা দেওয়া, প্রতিটি বাগানেই জলাধার তৈরি করা এবং সেচ পদ্ধতি চালু রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. ইসমাইল হোসেন জানান, চায়ের জন্য ২০থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উত্তম। তবে সর্বোচ্চ ২৯ ডিগ্রি পর্যন্ত চা গাছ তাপ সহ্য করতে পারে। এর উপরে গেলেই খরায় পড়বে চা। চা পাতায় দেখা দিবে বাঞ্জি দশা। তবে চা বাগানে প্রতি ২০ ফিট অন্তর অন্তর সেড টি থাকলে তা ৩৫-৩৬ ডিগ্রি পর্যন্ত সহনীয়। তিনি আরও বলেন, সূর্যালোকের উপস্থিতিতে গাছের পাতায় অবস্থিত ক্লোরফিলের মাধ্যমে গাছ যেভাবে পানি বা রস আহরণ করে, তাপমাত্রা ২৯ ডিগ্রি পাড় হলেই এই স্বক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। বাতাস থেকে যে কার্বনডাই অক্সাইডের মাধ্যমে গ্লোকুজ বা সরকরা জাতীয় খাদ্য উৎপাদন করে অতিরিক্ত সূর্যালোকের কারনে সেটাও বাঁধাগ্রস্ত হয়। বর্তমানে মৌলভীবাজারের তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি থেকে ৩৬ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠানামা করছে। যার সকল মাত্রা অতিক্রম করেছে। এ অবস্থায় থেমে গেছে চায়ের পাতা বৃদ্ধি। যাকে চা বাগানের ভাষায় বলে বাঞ্জি দশা।
১৬ ঘন্টা ৮ মিনিট আগে
১ দিন ২০ ঘন্টা ৩৮ মিনিট আগে
২ দিন ১২ ঘন্টা ১৩ মিনিট আগে
৩ দিন ২১ ঘন্টা ৪৩ মিনিট আগে
৯ দিন ১৯ ঘন্টা ৭ মিনিট আগে
১০ দিন ২২ ঘন্টা ১৪ মিনিট আগে
১৩ দিন ৩ ঘন্টা ১৫ মিনিট আগে