মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা এবং মামলাবাজিসহ নানা অভিযোগে আলোচিত পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ড বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য মোঃ আলতাফুর রহমান ওরফে নাজমুল হাসানের বিরুদ্ধে অবশেষে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে পৌর বিএনপি।
ওই ওয়ার্ড নেতার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিককালে নানা অপকর্মের অভিযোগ উঠায় তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সকালে শ্রীমঙ্গল পৌর বিএনপির আহবায়ক শামীম আহমেদ, সিনিয়র আহবায়ক মোঃ মিল্লাত হোসেন মিরাশদার এবং যুগ্ন আহবায়ক মোঃ রাশিদুল হাসান এর যৌথ স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অব্যাহতির তথ্যটি নিশ্চিত করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মো. আলতাফুর রহমান নাজমুল হাসান আশীদ্রোণ ইউনিয়নের চারটি গ্রামের সাধারণ মানুষের নামে একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানী, সরকারি বিভিন্ন অফিসে গিয়ে দলীয় পরিচয়ে দাপট দেখানো, সংবাদ প্রকাশের জন্য দৈনিক খোলা কাগজ পত্রিকার মৌলভীবাজারের স্টাফ রিপোর্টার মো. এহসানুল হক (মো. এহসান বিন মুজাহির) এর বিরুদ্ধে আদালতে হয়রানি মামলা দায়ের, ভুয়া স্কুল স্থাপন করে সরকারি পাঠ্যপুস্তক গ্রহণ করে তা ভাঙারির দোকানে বিক্রিসহ নানা কারনে পুরো উপজেলায় আলোচিত হয়ে ওঠেন। এমনকি তার রোষানল থেকে রক্ষা পায়নি নিজ দলের নেতাকর্মীও।
সম্প্রতি পৌর বিএনপির ৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির আহবায়ক আশরাফুল ইসলাম লিয়াকত, আশীদ্রোণ ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের আসামি করেও মামলা দায়ের করে। এসব কারনে শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিক সমাজ ও দলের নেতাকর্মীদের মাঝে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ বিরাজমান।
নির্ভীক অনুসন্ধানী সাংবাদিক এহসানুল হকের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রতিবাদে ও আলতাফুর রহমানের শাস্তির দাবিতে গত ১৩ এপ্রিল শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের আয়োজনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এর তিন দিনের মাথায় আলতাফুর রহমানের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিলো শ্রীমঙ্গল পৌর বিএনপি।
অব্যাহতি পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, "দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংগঠন বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার জন্য বিএনপির ২ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির সদস্য মো. আলতাফুর রহমান নাজমুল হাসানকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রাথমিক সদস্য পদসহ সকল পর্যায়ের পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে।"
এর আগে গত ৯ এপ্রিল দৈনিক খোলা কাগজের শেষ পাতায় ‘বিএনপির ওয়ার্ড নেতার ক্ষমতার জোর কোথায়’ এবং গত ১১ এপ্রিল খোলা কাগজের শেষ পৃষ্ঠায় ‘বিএনপি নেতার দাপটে অতিষ্ঠ চার গ্রামের মানুষ; শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এছাড়া ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর দৈনিক খোলা কাগজে ‘আলতাফুরের কাছে জিম্মি’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
এসব প্রতিবেদনে আলতাফুর রহমানের বিরুদ্ধে সাবেক চিফ হুইপের স্বাক্ষর জাল করে কারাবাস, শতাধিক মানুষকে মিথ্যা এবং বানোয়াট মামলা দিয়ে হয়রানি, কোন ধরণের শ্রেণি ও অফিসিয়্যাল কার্যক্রম না থাকা হাজী এছাক মিয়া হাজেরা বেগম মডেল স্কুলের নামে প্রতি বছর প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকের বই সংগ্রহ, সরকারি বই ভাঙারি দোকানে বিক্রি, নানা ধরণের প্রতারণা এবং অনিয়ম দুর্নীতি অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
সংবাদ প্রকাশের ৬ মাস পর অভিযুক্ত আলতাফুর রহমান নাজমুল হাসান খোলা কাগজের মৌলভীবাজারের নিজস্ব প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে ৪২০,৪১৭,৩৮০,৩৮২,৪৭০ ধারাসহ বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে গত ৬ এপ্রিল মৌলভীবাজার চীফ লিগ্যাল এইড অফিসার (যুগ্ন জেলা ও দায়রা জজ) আদালতে মানহানীর মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় বিএনপি নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারি, কৃষক ও স্থানীয় আরো ১৫জনকে আসামি করেন।
এদিকে অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের জেরে শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ সাংবাদিক এহসান বিন মুজাহিরের বিরুদ্ধে মিথ্যা বানোয়াটি ও হয়রানি মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে প্রতিবাদে সোচ্চার ছিল শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব। আয়োজন করা হয় প্রেসক্লাবে জরুরি সভা। ডাক দেওয়া প্রতিবাদ কর্মসূচির। গত রবিবার (১৩ এপ্রিল) শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের আয়োজনে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিবাদ সমাবেশে উপজেলায় বিভিন্ন প্রিন্ট ইলেকট্র্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার শতাধিক সাংবাদিকরা অংশগ্রহণ করে বক্তব্য দেন।
এসময় বক্তারা বলেন, শ্রীমঙ্গল পৌর বিএনপির ২ নং ওয়ার্ড আহবায়ক কমিটির সদস্য আলতাফুর রহমান নাজমুল হাসান দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরণের প্রতারণা, জালিয়াতিসহ নানা অন্যায়-দুর্নীতির সাথে জড়িত। তার বিরুদ্ধে কেউ টু-শব্দটিও করলে বা তার অপকর্মের প্রতিবাদ করলে মামলা করে হয়রানি, নানা ধরনের ভয়-ভীতি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পোস্ট করে প্রতিবাদকারীদের নাজেহাল করেন। আলতাফের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ উপজেলা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারাও। আলতাফ কর্তৃক হয়রানি মামলা থেকে রেহাই পাননি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিএনপি নেতা এমনকি গণমাধ্যমকর্মীরাও।
সাংবাদিকরা বলেন, আলতাফুর রহমানের দুর্নীতি ও নানা অনিয়ম নিয়ে শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ নির্ভীক সাংবাদিক এহসান বিন মুজাহির সংবাদ প্রকাশ করেন। অনুসন্ধানী সংবাদের জেরে ৬ মাস পর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মৌলভীবাজার আদালতে সাংবাদিক এহসানের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানি মামলা করেছেন তিনি। মামলাবাজ আলতাফ ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দলীয় পরিচয়ে এলাকার নিরীহ মানুষসহ ব্যক্তি সুবিধা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের হয়রানি করে আসছেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে ক্ষমতাসীন দল ও প্রশাসন থেকে এখনো কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
মানবন্ধনে নেতৃবৃন্দ অনতিবিলম্বে এহসান বিন মুজাহির এর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং মামলাবাজ আলতাফুর রহমান এর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। অন্যথায় সাংবাদিকসমাজ বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচি গ্রহণে বাধ্য হবে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণও করেছিলেন।
অন্যদিকে খোলা কাগজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলতাফুর রহমানের অপকর্ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং ক্ষোভ প্রকাশ করে উপযুক্ত বিচারের দাবি জানান ভুক্তভোগীরা। এমন পরিস্থিতিতে দলীয় ভাবমূর্তি রক্ষা এবং অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল থেকে তাকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এদিকে বহু অপকর্মের হোতা, মামলাবাজ মো. আলতাফুর রহমানকে দলের সকল পদ থেকে অব্যাহতির খবরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সরব হয়ে ওঠেছে। পোস্টের মাধ্যমে স্থানীয়রা স্বস্তি প্রকাশ করছেন।
তারা আশা করছেন, এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের হয়রানি ও আতঙ্ক থেকে মুক্তি মিলবে এবং এলাকায় স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসবে। তবে অভিযুক্ত ওই নেতার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বিষয়টির স্থায়ী সমাধানে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
২ ঘন্টা ২ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ১৪ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ৫৩ মিনিট আগে
৩ ঘন্টা ৩ মিনিট আগে
৪ ঘন্টা ২ মিনিট আগে
৬ ঘন্টা ৫ মিনিট আগে
৬ ঘন্টা ৩৩ মিনিট আগে