লালপুর–ঈশ্বরদী মহাসড়কে থামছে না মৃত্যুর মিছিল।।
আবু তালেব, লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি:
নাটোরের লালপুর থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়কের ঠাকুর মোড় থেকে আরামবাড়িয়া ব্রিজ—এই কয়েক কিলোমিটার রাস্তা যেন এখন এক অদৃশ্য মৃত্যুফাঁদ। প্রতিদিন, প্রায় প্রতিনিয়ত, এখানে ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ। আর প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে ভেঙে পড়ছে একটি পরিবার, থেমে যাচ্ছে অসংখ্য স্বপ্নের পথচলা।
এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করেন শ্রমজীবী, কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ নানা পেশার মানুষ। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাদের প্রতিটি যাত্রাই যেন এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ছুটে চলা।
স্থানীয়দের ভাষায়, “এটা আর সড়ক নেই, এটা এখন মৃত্যুর রাস্তা।” সবচেয়ে বেশি হৃদয়বিদারক হচ্ছে—এই দুর্ঘটনাগুলোতে প্রায়শই মারা যাচ্ছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। যে মানুষটি সকালবেলা ঘর থেকে বের হয়েছিলেন পরিবারের জন্য রুটি-রুজির সন্ধানে, সন্ধ্যায় ফিরছেন লাশ হয়ে। পেছনে রেখে যাচ্ছেন অসহায় স্ত্রী, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি সন্তান আর বৃদ্ধ বাবা-মা।
কিছুদিন আগেও এই সড়কের পাশের এক গ্রামের এক তরুণ তার মোটরসাইকেলে কাজে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ বিপরীত দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগতির ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ—মুহূর্তেই নিভে যায় একটি পরিবারের একমাত্র আলোর প্রদীপ। এমন ঘটনা এখানে নতুন নয়, বরং নিয়মিত এক বেদনাদায়ক বাস্তবতা।
গত (২৪ মার্চ) উপজেলার নবীনগরে ইজিবাইক ও ট্রাকের সংঘর্ষে ৩ জন মারা যান। আবার (৪ এপ্রিল) গৌরীপুরে রাস্তা পারাপারের সময় টিফিন শেষে বিদ্যালয়ে ফেরার পথে ট্রাক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। এছাড়া ঈদের দিন মন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুলের সঙ্গে দেখা করতে এসে তার দলের এক গুরুত্বপূর্ণ নেতার মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। এমন কোনো দিন নেই, যেদিন এখানে দুর্ঘটনা ঘটছে না।
এই মৃত্যু আর এই মৃত্যুফাঁদের দায়ভার কে নেবে? এটা কোনো রাস্তা নয়, এটা এখন এক মৃত্যুফাঁদ।
এই মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ—
* সড়কের মাঝখানে কোনো ডিভাইডার নেই
* দ্রুতগতির ভারী যানবাহনের অবাধ চলাচল
* বিপরীত দিকের যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ
* পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ডের অভাব
* ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা
* স্থানীয় ছোট যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল
ফলে প্রতিদিনই ঘটছে মোটরসাইকেল-ট্রাক, ট্রাক-সিএনজি, ট্রাক-অটোরিকশা, ট্রলি ও ট্রাক্টরের সংঘর্ষ।
এলাকাবাসীর একটাই জোরালো দাবি—
ঠাকুর মোড় থেকে আরামবাড়িয়া ব্রিজ পর্যন্ত অবিলম্বে ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে।
সাথে আরও প্রয়োজন—
* স্পিড ব্রেকার স্থাপন
* পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট
* সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড
* ট্রাফিক পুলিশের স্থায়ী উপস্থিতি
* ভারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ
একটি সড়ক কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটি মানুষের জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। কিন্তু যখন সেই সড়কই মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা শুধু অবহেলার নয়, বরং এক নির্মম ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
ঠাকুর মোড় থেকে আরামবাড়িয়া পর্যন্ত এই মহাসড়ক এখন প্রতিনিয়ত কেড়ে নিচ্ছে স্বপ্ন, ভেঙে দিচ্ছে পরিবার।
আর কত প্রাণ গেলে জাগবে কর্তৃপক্ষ?
আর কত সন্তান এতিম হলে মিলবে নিরাপদ সড়ক?
সময়ের দাবি একটাই—
এখনই পদক্ষেপ নিন, নইলে থামবে না এই মৃত্যুর মিছিল।