শ্রীমঙ্গলের একমাত্র সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় চলছে পুরুষ শিক্ষকে, নেই একজন নারী শিক্ষক মানবাধিকার ও বাক স্বাধীনতা নিশ্চিতে জয়পুরহাটে হেযবুত তওহীদের মতবিনিময় সভা শ্যামনগরে দলিত নারী ও কিশোরীদের উন্নয়নে মত বিনিময় সভা শ্যামনগরে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার বিষয়ক মতবিনিময় সভা যশোরে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নির্মাণকাজের উদ্বোধন নওগাঁর নিয়ামতপুরে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য প্রাক-বাজেট সভা অনুষ্ঠিত স্মৃতির উলশীতে তারেক রহমান: জনসমুদ্রে ভাসল যশোর শেরপুরে নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নিলেন ফরিদা ইয়াসমিন সাতক্ষীরায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস নিয়ে প্রেস ব্রিফিং স্বর্ণালংকারের লোভে বীথিকা রানী ঘোষকে হত্যা মাইক বাজিয়ে আ.লীগের স্লোগান, পুলিশ দেখে পালালো যুবক শিবচরে জমি সংক্রান্ত বিরোধে সংঘর্ষ : নারী সহ আহত ২ নোয়াখালীতে গাঁজাসহ হাতেনাতে ধরা, ৪ মাদকসেবীর দণ্ড ‎নিয়ামতপুরে জমি সংক্রান্তের জেরে বৃদ্ধাকে পিটিয়ে জখম ‎ হাবিপ্রবিতে বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবস উদযাপিত গোয়ালন্দে সিলেবাসে পৃষ্ঠাসংখ্যার ফাঁদ, নির্দিষ্ট বই কিনতে বাধ্য শিক্ষার্থীরা লালপুর–ঈশ্বরদী মহাসড়কে থামছে না মৃত্যুর মিছিল।। ‘অপতথ্য রোধে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করবে’ জাপানে ৬.২ মাত্রার ভূমিকম্প বাবার স্মৃতি বিজড়িত শার্শার উলসী খাল পুনঃখনন করলেন প্রধানমন্ত্রী

শ্রীমঙ্গলের একমাত্র সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় চলছে পুরুষ শিক্ষকে, নেই একজন নারী শিক্ষক

শিক্ষক পদ শূন্য ৫, নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষকশিক্ষার্থীদের মানসিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে


মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের একমাত্র সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোন নারী শিক্ষক না থাকায় মেয়েরা মানসিক, শারীরিক সমস্যাসহ নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বিশেষ করে কিশোরী বয়সের শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে পুরুষ শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলতে তারা সংকোচ বোধ করছে। নারী শিক্ষক না থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা চরম বিপাকে পড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিদ্যালয়টিতে দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রমেও তৈরি হচ্ছে জটিলতা। 

বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৬০০ ছাত্রী অধ্যয়নরত থাকলেও সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে পাঁচটি। যার কারণে পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে। 

স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক না থাকায় ছাত্রীরা মানসিক জড়তা, বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্যগত পরামর্শ ও একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে পারছে না। এতে তাদের শিক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হলেও এখনো প্রতিকার মেলেনি। 

সর্বশেষ গত ১০ মার্চ নারী শিক্ষক চেয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করেছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ জহির আলী। আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। নারী শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে এ বিদ্যালয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। প্রতিষ্ঠানটি মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলেও দীর্ঘদিন থেকে এ প্রতিষ্ঠানে কোনো নারী শিক্ষক নেই। ফলে মেয়েরা অহরহ তাদের ব্যক্তিগত নানাবিধ সমস্যার সম্মুখিন হচ্ছে। বিশেষ করে মেয়েরা তাদের বয়ঃসন্ধিকালীন জটিল সমস্যাগুলো বিদ্যালয় চলাকালীন সময়ে পুরুষ শিক্ষকদের সাথে মনখুলে বলতে পারে না। এতে তারা চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। 

বিদ্যালয় সুত্রে জানা গেছে, নারী শিক্ষকের বিষয়টি একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। এমনকি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে গত বছরের ১ মে সিলেট বিভাগের বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সমন্বয় কমিটির সভায় শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের নারী শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ওই বছরের ২১ মে সিদ্ধান্তটি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়। কিন্তু এখনো এই বিদ্যালয়ে একজন নারী শিক্ষকও পদায়ন করা হয়নি। 

নবম শ্রেণির তাসমিনা বলেন, মেয়েদের শারিরীক নানা সমস্যা থাকে। এর মধ্যে অনেকের মিনস হয়। পেট ব্যাথা করে। কাপড়ে দাগ হয়। এই কথাগুলো তো আর স্যারদের বলা যায় না। যদি আমাদের স্কুলে নারী শিক্ষক থাকতো তাহলে এমন বিড়ম্বনায় পড়তে হতো না।  মেয়েদের কথা বিবেচনা করে দ্রট্টু এখানে অন্তত দুজন নারী শিক্ষক দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করছি। 

অষ্টম শ্রেণি জয়া রবি বলেন, জাতীয় দিবস, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানে আমরা খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করে থাকি। নারী শিক্ষক না থাকায় বিভিন্ন সময় নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। বিশেষ করে আমরা যখন যেমন খুশি তেমন সাজি এবং কোন অনুষ্ঠানে ব্যতিক্রম পোশাক ব্যবহার করতে হয় তখন সমস্যার পরিমাণ আরো বেশি হয়। 

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী লুবাবা বলেন, আমরা যখন স্কুলের হয়ে উপজেলা জেলা এমনকি বিভাগীয় শহরে খেলাধুলা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে যাই তখন নারী শিক্ষক না থাকায় সীমাহীন সমস্যায় পড়তে হয়। 

অভিভাব মিলন মিয়া, জামিলা খাতুন, রিপন দাস ও আবুল হোসন বলেন, স্কুলে আসার পর হঠাৎ করেই মেয়েদের মেয়েলী শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হলে সে বিষয়টা পুরুষ শিক্ষককে তারা বলতে পারে না বা লজ্জা পান। স্কুলে যদি কমপক্ষে এক বা দু’জন নারী শিক্ষকও থাকতেন অন্তত তারা তাদের সমস্যার বিষয়টা সহজে বলতে পারতো এবং সমস্যার তাতক্ষণিক সমাধান পাওয়া সম্ভব হতো। 

অভিভাকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, শহরের প্রাণকেন্দ্র মৌলভীবাজার রোডে অবস্থিত প্রায় শতবর্ষী পুরানো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি মেয়েদের শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত হলেও শুরু থেকেই নারী শিক্ষকের অভাব রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নারী শিক্ষকের জন্য অনেকবার কর্তৃপক্ষর সুদৃষ্টি কামনা করলেও কোন সুরাহা হয়নি। অথচ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দিকে তাকালে দেখবেন উল্টো চিত্র। ছেলেদের চেয়ে মেয়ে শিক্ষকই অধিক। 

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) টিআইবি শ্রীমঙ্গলের সাবেক সভাপতি শিক্ষক দ্বীপেন্দ্র ভট্টাচার্য বলেন, এটি একটি মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অথচ এখানে একজন নারী শিক্ষক নেই। সব জায়গাতেই নারীদের এটি নিদিষ্ট  কোটা আছে। অথচ নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই নারী শিক্ষক, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। মেয়েদের মানসিক বিকাশ ও সমস্যা বোঝার জন্য নারী শিক্ষকের বিকল্প নেই।

শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ জহির আলী বলেন, তিনি ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে এ স্কুলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে আছেন। তাঁর আগে যিনি দায়িত্বে ছিলেন তিনিও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি স্কুলে যোগদান করার পর কোন নারী শিক্ষক পাননি। একজন শিক্ষক ছিলেন ২০২৩ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর থেকে এ প্রতিষ্ঠানে কোন নারী শিক্ষক নেই। বর্তমানে বিদ্যালয়ে ১৯ জন শিক্ষকের মধ্যে স্কুলে আছেন ১৪ শিক্ষক। ৫জন শিক্ষক সংকট। 

প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) জহির আলী আরো বলেন, স্কুলে মহিলা শিক্ষক চেয়ে আমি জেলা শিক্ষা অফিসার, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সিলেট আঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর একাধিককার লিখিত আবেদন করেছি। এখনো একজন নারী শিক্ষকও এখানে পদায়ন করা হয়নি। 

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, আমি সদ্যযোগদান করেছি। তবে ওই বিদ্যালয়টিতে আমার দুইদিন যাওয়া হয়েছে। নারী শিক্ষক শূন্যের বিষয়টি শুনেছি। এ ব্যাপারে আমি জেলার মিটিংয়ে আলাপ করবো। নারী শিক্ষক পদায়নের ব্যাপারে আমার পক্ষ থেকে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাবো। 

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা সিলেট অঞ্চল সিলেটের পরিচালকের কার্যালয়-এর পরিচালক প্রফেসর ড. মো. দিদার চৌধুরী বলেন, বালিকা বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক না থাকাটা মেয়েদের জন্য আসলেই বিড়ম্বনার বিষয়।  এ ব্যাপারে আমি অতিদ্রুততই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর মহাপরিচালক বরাবর চিঠি পাঠাবো। এছাড়া মৌলভীবাজার জেলার অন্য কোনো বালক ও বালিকা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ডেপুটেশনে শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পদায়নের ব্যাপারে তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। 

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (মাধ্যমিক শাখা)  মো. ইউনুছ ফারুকী বলেন, সামনে নতুন নিয়োগ হলে এ বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক পদায়নের চেষ্টা করা হবে। তবে এর আগে শ্রীমঙ্গলে নারী শিক্ষক পদায়নের ব্যাপারে তিনি চিন্তা করছেন বলেও জানান।

Tag
আরও খবর