মাদক সম্রাট থেকে মানবপাচারের গডফাদার: রুবেল শেখ।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থেকে দুবাই। আপাতদৃষ্টিতে তিনি একজন সফল প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর অন্ধকার জগৎ। মাদক সম্রাট থেকে মানবপাচারের গডফাদার—এক রুবেল শেখের নিষ্ঠুরতায় আজ নিঃস্ব মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জের শত শত পরিবার। ইতালির স্বপ্ন দেখিয়ে লিবিয়ার টর্চার সেলে যমদূত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এই রুবেল।মাদকের হাত ধরে অপরাধে হাতেখড়ি, অনুসন্ধানে জানা যায়, রুবেলের অপরাধ জগতের শুরু হয় বাংলাদেশ থেকেই। ২০১৮ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাড়ি দেওয়ার আগে তিনি নিয়মিত মাদক কারবারে জড়িত ছিলেন। ২০১৮ সালের একটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত আসামি (এফআইআর নং-১৩/৩৬২)। আইনের হাত থেকে বাঁচতে এবং অপরাধের সাম্রাজ্য বড় করতে তিনি দুবাই পাড়ি জমান। কিন্তু সেখানে গিয়ে শুরু করেন আরও নৃশংস ব্যবসা—'মানবপাচার'।
লিবিয়ার টর্চার সেল ও ‘মাফিয়া নাটক’
মাদারীপুর জেলার ডাসার, কালিকাপুর, চরনাচনা, মোস্তফাপুর কিংবা শিবচর—প্রতিটি জনপদে এখন কেবলই হাহাকার। ইতালির লোভ দেখিয়ে জনপ্রতি ২০ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে রুবেলের সিন্ডিকেট। কিন্তু গন্তব্য ইতালি নয়, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা হচ্ছে লিবিয়ার মরুভূমিতে।
ভুক্তভোগী এক পরিবারের সদস্য গোলাপ (ছদ্মনাম) জানান, "আমাদের বলা হয়েছিল ইতালি পাঠাবে। কিন্তু লিবিয়া নিয়ে আমার ছেলেকে বন্দি করেছে। এরপর ভিডিও পাঠায়—পিটাচ্ছে, রক্ত ঝরছে। বলে মাফিয়ারা ধরেছে, আরও ১০ লাখ টাকা না দিলে মেরে ফেলবে।" রুবেলের এই কৌশলী ব্যবসার নাম ‘মাফিয়া নাটক’। নিজের লোক দিয়ে বন্দিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে সেই ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ। কেউ টাকা দিয়েও মুক্তি পায়নি, আবার কেউ কেউ টর্চার সেলে ক্ষুধা আর অত্যাচারে না ফেরার দেশে চলে গেছেন।মাদারীপুরে সক্রিয় ৩০ সদস্যের সিন্ডিকেট।
সাম্প্রতিককালে ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বৈধভাবে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলেও মাদারীপুর অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের অন্তত ৩০ জন সদস্য স্থানীয়ভাবে প্রলোভন দেখিয়ে সহজ-সরল যুবকদের ফাঁদে ফেলছে।গত ৫ বছরে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে বিদেশ যাত্রাকালে নৌকাডুবিতে মাদারীপুরের চার উপজেলার (সদর, রাজৈর, শিবচর ও কালকিনি) অর্ধশত কিশোর-যুবক মারা গেছেন। নিখোঁজ রয়েছেন কয়েকশ। তিউনিশিয়া উপকূল ও ভূমধ্যসাগরে যাদের মৃত্যু হচ্ছে, তাদের অধিকাংশই এই অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের সন্তান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রে বেশ কয়েকজন নারী দালাল রয়েছে এরা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে যুবক সংগ্রহ করে।
প্রশাসনের ভূমিকা ও বর্তমান পরিস্থিতি,
রুবেল শেখের বিরুদ্ধে ২০২১ সালে মাদারীপুরের ডাসার থানায় একটি মানবপাচার মামলা (জিআর নং-৫৪) হলেও প্রশাসনের চোখে সে এখনো ‘ফেরারি’। দুবাইয়ে বসে সে অনায়াসেই নিয়ন্ত্রণ করছে মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জের পাচার সিন্ডিকেট।
মাদারীপুরের পুলিশ সুপার বলেন, "ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অসচেতনতার সুযোগে পাচারকারীরা হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা, ভুক্তভোগীরা শুরুতেই অভিযোগ দিতে চান না। তবে আমরা দালালদের তালিকা তৈরি করছি এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করছি।"
বাংলাদেশ পুলিশের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাও ইন্টারপোলের মাধ্যমে রুবেল শেখ কে খুঁজছে।
রুবেল শেখের মতো অপরাধীরা বিদেশের মাটিতে বসে দেশের মানুষের রক্ত চুষে খাচ্ছে। একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি হয়েও কীভাবে সে বছরের পর বছর এই বিশাল চক্র চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মাদারীপুর থেকে লিবিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই ‘রক্তখেকো’ সিন্ডিকেট উপড়ে ফেলাই এখন সময়ের দাবি। অনুসন্ধান চলমান রয়েছে, আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য নিয়ে পরবর্তী পর্বে হাজির হচ্ছি।
কে এই রুবেল, তাঁর এনআইডি, বাংলাদেশি পাসপোর্ট, দুবাইয়ের আকামা সহ মানব পাচারকারী রুবেলের বিরুদ্ধে পাশবিক নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর ভিডিও ফুটেজ অনুসন্ধানী টিমের হাতে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, লিবিয়াতে অবস্থান করে তিনি এসব নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্যসহ আরও বিস্ফোরক তথ্য নিয়ে খুব শিগগিরই আসছে দ্বিতীয় পর্ব—আমাদের সাথেই থাকুন।
১ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে
১১ ঘন্টা ১৩ মিনিট আগে
১১ ঘন্টা ৫৫ মিনিট আগে
১১ ঘন্টা ৫৬ মিনিট আগে
১৪ ঘন্টা ৫৫ মিনিট আগে
১৫ ঘন্টা ৬ মিনিট আগে
১৫ ঘন্টা ৭ মিনিট আগে