ক্ষেতলালে টানা দুই দিনের দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট; চরম ভোগান্তিতে হাজারো গ্রাহক
ক্ষেতলাল (জয়পুরহাট) প্রতিবেদক : জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে টানা দুই দিনের দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েক হাজার গ্রাহক। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় জনজীবনে স্থবিরতা নেমে এসেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পোল্ট্রি খামারি, মৎস্য চাষী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, অটোরিকশা চালক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ গ্রাহকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ জুন সোমবার দিবাগত রাত ৩টা থেকে ৯ জুন মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত প্রায় ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এরপর ১০ জুন বুধবার সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত (এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত) বিদ্যুৎ না থাকায় ভোগান্তি আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টি বা হালকা ঝড় হলেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এক থেকে দুই ঘণ্টা, কখনও তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। তবে গত দুই দিনের দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
ক্ষেতলাল পৌর এলাকার ভাশিলা মহল্লার পোল্ট্রি খামারি সামছুল ইসলাম বলেন, “আমার খামারে প্রায় তিন হাজার মুরগির বাচ্চা রয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ভ্যাপসা গরমে বাচ্চাগুলো খাবার কম খাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।”
উপজেলার বেলগাড়ী গ্রামের মৎস্য চাষী শাহজাহান আলী বলেন, “দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পুকুরে সেচ দিতে পারছি না। মাছ বাজারেও নিতে সমস্যা হচ্ছে। এতে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এইচএসসি পরীক্ষার্থী বলেন, “পরীক্ষা সামনে থাকায় নিয়মিত পড়াশোনা করতে হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে ঠিকমতো পড়তে পারছি না। মোবাইল চার্জ না থাকায় অনলাইনেও প্রয়োজনীয় তথ্য দেখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে আমাদের প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছে।”
পৌর মহল্লার ধনকুড়াইল গ্রামের ভ্যানচালক গোলাম রব্বানী বলেন, “প্রচণ্ড গরমে সারাদিন ভ্যান চালিয়ে বাড়ি ফিরে একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগও পাচ্ছি না। বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্যান চলে না, রাতে ঘুমাতেও কষ্ট হচ্ছে। পরিবারের ছোট শিশু ও বয়স্ক সদস্যরাও অনেক ভোগান্তিতে আছেন।”
অটোরিকশা চালক রাকিব বলেন, “অটোর ব্যাটারি চার্জ দিতে না পারায় নিয়মিত ট্রিপ দিতে পারছি না। ফলে আয় কমে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকলে চার্জিং স্টেশনগুলোও বন্ধ থাকে বা অতিরিক্ত ভিড় হয়। এতে আমাদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।”
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বিষয়ে জানতে ক্ষেতলাল পল্লী বিদ্যুতের অভিযোগ কেন্দ্রের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করলে অধিকাংশ সময় ফোন ব্যস্ত পাওয়া যায়। আবার কখনও ফোন রিসিভ করা হলেও সন্তোষজনক কোনো তথ্য না দিয়ে দ্রুত কল কেটে দেওয়া হয়। তাদের প্রশ্ন, একই ধরনের সমস্যার কারণে বারবার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলেও কেন এর স্থায়ী সমাধান করা হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার পুনরাবৃত্তিতে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মোবাইল ফোন, পানির মোটর, ফ্রিজসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে না পেরে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিক্রি কমে গেছে এবং অনলাইনভিত্তিক কাজেও বিঘ্ন ঘটছে।
এদিকে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষেতলাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও রোগী ও তাদের স্বজনদের দুর্ভোগ বেড়েছে। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় চিকিৎসাসেবা গ্রহণে নানা বিড়ম্বনার সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী দ্রুত সমস্যার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করে স্থায়ী সমাধানের জন্য জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে ক্ষেতলাল সাব-স্টেশনের এরিয়া পরিচালক মাহমুদুল হাসান চৌধুরী রকেট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক পোস্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণ ও চলমান মেরামত কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন।
ক্ষেতলাল সাব-স্টেশনের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম) তৌকির আহম্মেদ বলেন, “গত দুই দিন ধরে সামান্য ঝড়বৃষ্টি হলেই ৩৩ কেভি মেইন সঞ্চালন লাইনে ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। লাইনের কোথাও ইনসুলেশনজনিত সমস্যা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্ষেতলাল ও জেলা পর্যায়ের একাধিক টিম যৌথভাবে কাজ করছে। তবে এখনো ত্রুটির নির্দিষ্ট স্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। দ্রুত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।