শরতের শুভ্র কাশবনের দোলা আর হিমেল হাওয়ার পরশ নিয়ে সাতক্ষীরায় শুরু হয়েছে প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী আনন্দ মেলা ও লোকজ উৎসবের প্রতীক গুড়পুকুর মেলা। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে শহরের ঐতিহ্যবাহী শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক প্রাঙ্গণে বর্ণিল ফিতা কেটে এবং আকাশে রঙিন বেলুন ও ফেস্টুন উড়িয়ে ২০ দিনব্যাপী এই মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই মেলা চলবে আগামী ২০ অক্টোবর পর্যন্ত।
মেলার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, "বাঙালির চিরায়ত লোকজ সংস্কৃতি, প্রাচীন মেলা ও হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে সুন্দরভাবে তুলে ধরতে এ ধরনের আয়োজন অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কেনাকাটায় বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্তানাদি নিয়ে আনন্দ উদযাপনের জন্য শহরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে এই মিলনমেলা এক অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর পাশাপাশি জনমনে স্বস্তি এনে দেবে এই মেলা। মেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা, পরিবেশ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে জেলা প্রশাসন থেকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা হবে।"মেলা প্রাঙ্গনে নিরাপত্তার স্বার্থে সি সি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম। মেলার সর্বাঙ্গীণ নিরাপত্তা ও জনভোগান্তি এড়ানোর বিষয়ে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন, "উৎসবের আনন্দকে নিষ্কণ্টক, নির্বিঘ্ন ও সাধারণ মানুষের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণ ও তার আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীরা যাতে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে কেনাকাটা এবং বিনোদন উপভোগ করে ঘরে ফিরতে পারেন, সে লক্ষ্যে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকবে।"
উদ্বোধনী পর্বে অন্যান্যের মধ্যে আর ও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রিপন বিশ্বাস, সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আসাদুজ্জামান, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্ণব দত্ত, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এইচ এম রহমতুল্লাহ পলাশ, এবং সদস্যসচিব আবু জাহিদ ডাবলু। এছাড়াও অনুষ্ঠানে স্থানীয় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার স্থানীয় সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
শরতের এই জমকালো আয়োজনে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক প্রাঙ্গণ যেন রঙিন উৎসবের এক নতুন রূপে সেজে উঠেছে। মেলার ভেতর ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় মিলিয়ে স্থান পেয়েছে প্রায় দুই শতাধিক বৈচিত্র্যময় স্টল। এতে স্থান পেয়েছে আকর্ষণীয় সব মনোহরি সামগ্রী, চিরায়ত বাংলার হারিয়ে যেতে বসা বাঁশ ও বেতের নিপুণ শিল্পকর্ম,বাচ্চাদের জন্য নাগরদোলা, গাড়িসহ বিভিন্ন খেলনা, গৃহস্থালি লৌহজাত দ্রব্যাদি এবং মুখরোচক সব ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ও খাবারের দোকান। শুধু সাতক্ষীরা স্থানীয় ব্যবসায়ীরাই নন, বরং দেশের দূর-দূরান্তের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা তাদের মনকাড়া পসরা সাজিয়ে বসেছেন এই মেলায়।
মেলায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা প্রথম দিন থেকেই দর্শনার্থীদের উৎসাহ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। রাজবাড়ি থেকে আসা খেলনা বিক্রেতা হারুন অর রশিদ তার অনুভূতি প্রকাশ করে জানান, "আমি প্রতি বছরই সাতক্ষীরার এই মেলায় আসার চেষ্টা করি। এবারও শিশুদের মন জয় করার মতো অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও বৈচিত্র্যময় সব খেলনার সংগ্রহ নিয়ে এসেছি। মেলার প্রথম দিন দুপুর থেকেই যে হারে মানুষের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তাতে আমরা অত্যন্ত আশা জাগানো বেচাকেনার প্রত্যাশা করছি।"
মেলায় স্টল দেওয়া ঢাকা থেকে আগত চশমা বিক্রেতা দুলাল হোসেন বলেন, "শহরের প্রাণকেন্দ্রে মেলার আয়োজনটি সত্যিই চমৎকার হয়েছে। আমরা তরুণদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে নতুন নকশার আধুনিক ও মানসম্মত চশমার কালেকশন এনেছি। আয়োজক ও প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ চমৎকার। আশা করছি মেলা যত দিন গড়াবে, আমাদের বিক্রিও তত বাড়বে।"
অন্যদিকে, শিশুদের বিনোদন ও আনন্দের মাত্রা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে মেলা প্রাঙ্গণে বসানো হয়েছে নাগরদোলা, জাদুকরী ও ছোটদের প্রিয় ট্রেনগাড়ি। প্রথম দিনেই ছোটদের উচ্ছ্বসিত কলকাকলি, হাসি ও ভিড়ে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠেছে। অভিভাবকরাও সন্তানদের এই আনন্দ উপভোগ করতে দেখে খুশি।
মেলার সার্বিক শৃঙ্খলা ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। যেকোনো ধরনের চাঁদাবাজি, জুয়ার আসর বা অপ্রীতিকর ঘটনা কঠোর হাতে রোধ করতে পুরো মেলা এলাকাকে সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরা দিয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। প্রবেশ ও বাইরে বের হওয়ার পথগুলোতে পুলিশের তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে। পাশাপাশি মেলার ভেতরে ও বাইরে সাদা পোশাকের পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক বিশেষ টিম নজরদারিতে রয়েছে, যেন কোনো অপরাধী চক্র বা বিশৃঙ্খলাকারী পার না পায়। সব মিলিয়ে মেলাকে কেন্দ্র করে পুরো সাতক্ষীরা শহর জুড়ে উৎসবের হাওয়া বইছে।
১৭ ঘন্টা ৪১ মিনিট আগে
১৮ ঘন্টা ১৫ মিনিট আগে
১৯ ঘন্টা ২৭ মিনিট আগে
২২ ঘন্টা ২২ মিনিট আগে
২২ ঘন্টা ৫১ মিনিট আগে
২৩ ঘন্টা ৮ মিনিট আগে