নেসার উদ্দিন আহাম্মদ:
দেশে প্রতি বছর ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মানুষের কিডনি বিকল হচ্ছে। এরমধ্যে ১২ থেকে ১৫ হাজার কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস নিতে হয়। কিডনি বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশে প্রায় ২ কোটিরও বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। দিন দিন কিডনি রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে কিডনির প্রায় ৬৫ শতাংশ বিকল না হওয়া পর্যন্ত কিডনি রোগ ধরা পড়ে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিডনি রোগ থেকে বাঁচতে হলে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রোগ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এদিকে শিশুদেরও কিডনি সমস্যা দেখা দিচ্ছে অনেক। আর শিশু কিডনি রোগীদের মধ্যে ৫০ ভাগ ‘নেফ্রোটিক সিনড্রম’ রোগে ভুগছে।
আজ বিশ্ব কিডনি দিবস। প্রতি বছর এ দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে কিডনি দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। এ বছর বিশ্ব কিডনি দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় : ‘কিডনি হেলথ ফোর অল-ব্রিজ দি নলেজ গ্যাপ টু বেটার কেয়ার’ এটার বাংলা করা হয়েছে ‘সুস্থ কিডনি সবার জন্য-জ্ঞানের সেতুবন্ধনে সাফল্য’। দিবসটি উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।
ইনসাফ বারাকাহ কিডনি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিশিষ্ট ইউরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. এম ফখরুল ইসলাম বলেন, আটটি কাজ ও জীবন চর্চার মাধ্যমে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এগুলো হচ্ছে কায়িক পরিশ্রম, খেলাধুলা ও নিয়মিত ব্যায়াম করা। উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা। সুপ্ত উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত ব্লাড প্রেশার চেকআপ করা। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ করা, যাতে শাক-সবজি ও ফলমূল বেশি থাকে। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা। ধূমপান থেকে বিরত থাকা। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন না করা এবং নিয়মিত কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজির সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. ফিরোজ খান বলেন, কিডনিবিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৮৫ কোটি। বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটির বেশি লোক কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। দিন দিন কিডনি রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৪০ সালের মধ্যে ৫০ লাখের বেশি কিডনি বিকল রোগী সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসার অভাবে অকাল মৃত্যুবরণ করবে। মৃত্যুঘাতী হিসেবে কিডনি রোগের অবস্থান দুই যুগ আগে ছিল ২৭তম, বর্তমানে এটা দাঁড়িয়েছে ৭তম এবং ২০৪০ সালে ৫তম অবস্থানে পৌঁছাবে।
হলি ফ্যামেলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কিডনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এহতেশামুল হক জানান, দেশে প্রতি বছর ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মানুষের কিডনি বিকল হয়। এরমধ্যে ১২ থেকে ১৫ হাজার কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস নিতে হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডায়ালাইসিস থেকে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট ভালো। বর্তমানে দেশে ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা লাগে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে। তিনি জানান, বাংলাদেশে ১৯৮২ সাল থেকে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট শুরু হলেও মাঝে অনেক বন্ধ থাকে। পরবর্তিতে ১৯৮৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট শুরু হয়। পরে ধীরে ধীরে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে তা চলতে থাকে। এ পর্যন্ত তিন হাজার রোগীর কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘বিশ্ব কিডনি দিবস’ উপলক্ষ্যে তার দেওয়া বাণীতে বলেছেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা একটি গণমুখী স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করেছি এবং এই নীতি বাস্তবায়ন করছি। আমাদের সরকার নতুন মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, নার্সিং কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল, হেলথ টেকনোলজি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে। সাধারণ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ও চিকিৎসাসেবা বহুগুণে বৃদ্ধি করা হয়েছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সাড়ে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে শিশু ও মাতৃমৃত্যুহার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। পিএসসির মাধ্যমে নতুন কয়েক হাজার চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমাদের সরকারের গৃহীত নানামুখী পদক্ষেপের ফলে আমরা স্বাস্থ্য খাতে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছি, যা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হচ্ছে।
কিডনি রোগ একটি নীরব ঘাতক। সুস্বাস্থ্যের জন্য সুস্থ কিডনির বিকল্প নেই। অনেক কিডনি রোগ প্রতিরোধযোগ্য। কিডনি রোগের প্রতিরোধ ও চিকিৎসার বিষয়ে আমাদের সরকার যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে। আমাদের প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগ শনাক্ত করা সম্ভব। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ ও কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পাবে। কিডনি রোগের সব আধুনিক চিকিৎসা এখন আমাদের দেশেই সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। আমাদের সরকার জাতীয় কিডনি রোগ ইনস্টিটিউটে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে এবং নতুন ভবন নির্মাণ করেছে। দেশের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট ও জেলা সদর হাসপাতালে ১০ শয্যাবিশিষ্ট ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। আমরা স্বল্পমূল্যে ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা করেছি এবং কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ‘বিশ্ব কিডনি দিবস’ উপলক্ষ্যে তার বাণীতে বলেছেন, ‘কিডনি মানবদেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। শিশু, যুবক ও বৃদ্ধ সবার ক্ষেত্রেই সুস্থ কিডনির গুরুত্ব অপরিসীম। কিডনি রোগ একটি নীরব ঘাতক। বর্তমানে দেশে কিডনি রোগের প্রকোপ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ব্যথানাশক ও এন্টিবায়োটিক ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার, খাদ্যে ভেজাল, স্থূলতা ইত্যাদি কিডনি রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি লোক কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার লোক ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে জীবন ধারণ করছে। দেশের অনেক হাসপাতালে এ রোগের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। তাই প্রতিকারের পাশাপাশি কিডনি রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি খুবই জরুরি বলে আমি মনে করি।’
শিশু নেফ্রোলজির সহকারী অধ্যাপক ডা. সালমা জাহান জানান, শিশুদের ‘নেফ্রোটিক সিনড্রম’ এমন একটি রোগ যাতে রোগীর কিডনির গ্লুমেরুলাসের (ছাকনি) স্বাভাবিক কার্যকারিতা কিছুটা পরিবর্তন হয়ে যায়। আর এর ফলে রোগীর শরীরের প্রোটিন জাতীয় পদার্থ, বিশেষ করে অ্যালবুমিন শরীর থেকে বের হতে থাকে। স্বাভাবিক কিডনি গ্লুমেরুলাস দিয়ে অ্যালবুমিন বের হতে পারে না। শরীরে অ্যালবুমিন কমে যাওয়ার ফলে শরীরে চর্বি ও পানির পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং শরীর ফুলতে থাকে। নেফ্রোটিক সিনড্রমে আক্রান্ত শিশুদের খাবারের ব্যাপারেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ধীরে ধীরে কিডনি অকেজো হওয়ার প্রধান কারণ শতকরা ৪৫ ভাগ নেফ্রাইটিস, ২৫ ভাগ ডায়াবেটিস এবং ১৫ ভাগ উচ্চ রক্তচাপ। দেশের শতকরা ৯৫ ভাগ কিডনি রোগীর পক্ষেই এই ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়।
মাত্র ১০০০ টাকায় প্যাকেজে হেলথ চেকআপ : বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন, মহান স্বাধীনতা দিবস ও বিশ্ব কিডনি দিবস উপলক্ষ্যে মাসব্যাপী ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প উপলক্ষ্যে ইনসাফ বারাকাহ কিডনি অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে। গতকাল বুধবার সাংবাদিকদের নিয়ে মতবিনিময় সভায় এ তথ্য জানানো হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজির সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. ফিরোজ খান, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কিডনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এহতেশামুল হক, সভাপতিত্ব করেন ইনসাফ বারাকাহ কিডনি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিশিষ্ট ইউরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. এম ফখরুল ইসলাম। মতবিনিময় সভা পরিচালনা করেন হাসপাতালের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন।
সভায় মাসব্যাপি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের কর্মসূচি ঘোষণা করেন অধ্যাপক ডা. এম ফখরুল ইসলাম। ১০ মার্চ থেকে ০৯ এপ্রিল পর্যন্ত এ ক্যাম্প চলবে। ক্যাম্পে চিকিৎসকরা বিনামূল্যে রোগীদের চিকিৎসা পরামর্শ দিবেন। কিডনি সম্পর্কিত ইউরিন আরই এবং সিরাম ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা ফ্রি করা হবে। মাত্র ১০০০ টাকায় প্যাকেজে (আল্ট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি, সিবিসি, ইউরিন আরই এবং সিরাম ক্রিয়েটিনিন) হেলথ চেকআপ করবে। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হবে। প্রায় ৫০ শতাংশ ছাড়ে প্যাকেজে কিডনির পাথরের অপারেশন করা হবে। পঁচজন হত দরিদ্র রোগীকে এক বছর পর্যন্ত ডায়ালাইসিস ফ্রি করা হবে। ১৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের দ্বারা বিনামূল্যে রোগী দেখা হবে এবং পাঁচজন হতদরিদ্র গরিব শিশুর প্রস্রাবের রাস্তার জন্মগত ত্রুটির অপারেশন ফ্রি করা হবে। ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের দ্বারা বিনামূল্যে রোগী দেখা হবে এবং পাঁচজন হতদরিদ্র গরিব রোগীর প্রোস্টেট অপারেশন ফ্রি করা হবে। ডেন্টাল চেক-আপ ফ্রি করা হবে। চিকিৎসা ক্যাম্প চলাকালীন রেজিস্ট্রেশনভুক্ত রোগীদের জন্য উপরোক্ত সুবিধাগুলো প্রযোজ্য হবে। মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে লিফলেট বিতরণ, পোস্টার লাগানোর কথা জানান আয়োজক প্রতিষ্ঠান।
৭ ঘন্টা ৩৫ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে
৯ ঘন্টা ১৯ মিনিট আগে
১০ ঘন্টা ২৩ মিনিট আগে
১ দিন ৫০ মিনিট আগে
১ দিন ৫১ মিনিট আগে
১ দিন ৫৪ মিনিট আগে