◾ নিউজ ডেস্ক
সব ধরনের জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চলতি মাসের শেষের দিকে কিংবা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে এ ঘোষণা আসতে পারে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেছেন, জ্বালানি তেলের রেকর্ড পরিমাণ দাম বাড়ানোর পর ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে।
এ কারণে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কিছুটা সময় নিচ্ছে সরকার। সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ জানা গেলে দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হবে।
সংস্থাটির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শুনানির পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে দামের বিষয়ে আদেশ ঘোষণার আইনি বাধ্যবাধকতা আছে। ইতোমধ্যে তিন মাস পেরিয়ে গেছে। তাই ভর্তুকির পরিমাণ জানতে তাগাদা দিয়ে দ্বিতীয় দফায় চিঠি দেওয়া হয়েছে।
মানুষ যখন তীব্র মূল্যস্ফীতির সঙ্গে টিকে থাকার সংগ্রাম করছে, ঠিক তখনই জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফা বাড়িয়ে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি করেছে। পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে বাজারে নিত্যপণ্যের দামও হু-হু করে বেড়ে গেছে। করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি যেমন থমকে গিয়েছিল, একইভাবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আয়ের ওপরও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বহু মানুষ কাজ হারিয়েছে, অনেকের ব্যবসাও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আয় কমে এসেছে দেশের একটি বড় অংশের মানুষের। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম আবার বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের ওপর বিপর্যয় নেমে আসবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, ‘ভর্তুকি দিয়ে আপাতত বিদ্যুৎ খাতকে চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। অর্থ বিভাগ ভর্তুকির পরিমাণ এখনও নিশ্চিত করেনি। বিদ্যুতের প্রাইসের অ্যাডজাস্টমেন্টের ব্যাপারে আমরা অপেক্ষায় আছি। গ্যাসের ব্যাপারে আমরা আরেকটা অ্যাডজাস্টমেন্টে যেতে চাচ্ছি। কিছুদিন আগে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে।’
সূত্র বলছে, গত ১৮ মে বিদ্যুতের পাইকারি দাম বাড়ানোর বিষয়ে শুনানি হয়। এতে পাইকারিতে দাম ৩ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৫৮ পয়সা করার প্রস্তাব করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এতদিন সরকার ৩ টাকা ৩৯ পয়সা ভর্তুকি দিয়ে আসছিল। পিডিবির প্রস্তাব গ্রহণ করলে সরকারের আর ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম জানতে চেয়েছেন- সরকার ভর্তুকি দিতে চায় কি না। ২০২১-২২ অর্থবছরে পাইকারি বিদ্যুতে আর্থিক ঘাটতি প্রায় ৩০ হাজার ২৫২ কোটি টাকা। বিদ্যমান পাইকারি মূল্যহার ৫ টাকা ১৭ পয়সা। মূল্যহার ঘাটতি বিবেচনায় নিয়ে পাইকারি বিদ্যুতের রাজস্ব চাহিদা প্রাক্কলন করা হয়েছে এবং মূল্যহার ৮ টাকা ৫৮ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ঘাটতি সমন্বয়ে সরকারি ভর্তুকি বিবেচনা করা হয়নি। তার মানে যখন পিডিবি দাম বাড়ানোর প্রস্তাবনা তৈরি করে, তখন সরকার ভর্তুকি দিতে রাজি হয়নি? সরকার কি ভর্তুকি দিতে সম্মত না?
শুনানিতে বিইআরসির চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল বলেছেন, বিদ্যুতের পাইকারি দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা প্রমাণের দায়িত্ব পিডিবির। সর্বোচ্চ নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে আদেশ দেওয়া হবে।
বিইআরসির দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, পিডিবির প্রস্তাব যাচাই-বাছাই চলছে। বিদ্যুৎ বেচে বছরে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হতে পারে পিডিবির। এর মধ্যে সরকারি ভর্তুকি থেকে বড় অংশ পাওয়ার কথা। বাকিটা দাম বাড়িয়ে সমন্বয় করা হবে। একই সঙ্গে লোডশেডিংয়ের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমায় পিডিবির খরচ কমছে। আবার তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ বেড়েছে। পাইকারিতে মূল্যবৃদ্ধির পর ভোক্তাপর্যায়ে দাম বাড়াতে কমিশনে আবেদন করবে বিতরণকারী সংস্থাগুলো। তাদের প্রস্তাব নিয়ে শুনানির পর গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়বে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর গণশুনানিকালে বিইআরসির টেকনিক্যাল কমিটি পাইকারি বিদ্যুতে ২ টাকা ৯৯ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। কমিটির সুপারিশকেই গুরুত্ব দিয়ে চূড়ান্ত করা হচ্ছে বিদ্যুতের নতুন দাম। এমনিই ইঙ্গিত দিয়েছেন বিইআরসির একজন সদস্য। বিদ্যুতের পাইকারি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি হলেও খুচরা কোম্পানিগুলোও দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
এ বিষয়ে বিইআরসির সদস্য (বিদ্যুৎ) মোহাম্মদ বজলুর রহমান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী শুনানির পরবর্তী তিন মাসের মধ্যেই দাম বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আশা করি, চলতি মাসেই বিদ্যুতের নতুন দাম ঘোষণা করতে পারব। দাম কত টাকা বাড়বে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গণশুনানিতে বিইআরসির টেকনিক্যাল কমিটির একটি সুপারিশ মানুষ জেনেছে।
জানা গেছে, গত একযুগে ৯ বার বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। এ সময়ে পাইকারি পর্যায়ে ১১৮ শতাংশ এবং গ্রাহকপর্যায়ে ৯০ শতাংশ দাম বেড়েছে। সর্বশেষ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় সরকারি ভর্তুকি ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ধরে পাইকারি পর্যায়ে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়। একই সময়ে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। গত জুনে গ্যাসের দাম গড়ে ২৩ শতাংশ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ গত ৬ আগস্ট বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। এর প্রভাব পড়েছে পরিবহন, নিত্যপণ্যের বাজার, রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদনসহ নানা খাতে। এবার বিদ্যুতের দাম বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে।
পিডিবি বলছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। গত বছরের জুন থেকে ফার্নেস অয়েলে আমদানি শুল্ক চালু হয়েছে। এতে খরচ বেড়েছে ৩৪ শতাংশ। গত বছরের জুলাইয়ে কয়লার ওপর ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর আরোপ করা হয়েছে। বিশ্ববাজারে কয়লার দামও বেড়েছে। দেশে গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পাইকারি দাম গড়ে ৫ টাকা ১৭ পয়সা। পিডিবির খরচ হচ্ছে ৯ টাকার বেশি। ফলে ২০২১-২২ অর্থবছরে পিডিবির লোকসান হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা।
পাইকারি দাম ঘোষণা হলে খুচরার ওপর প্রভাব পড়বে। পিডিবি বর্তমান দর ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ১৭ পয়সা থেকে ৬৬ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ টাকা ৫৮ পয়সা করার প্রস্তাব করেছে। বিপিডিবির এ প্রস্তাব গ্যাসের বর্তমান দর বিবেচনায়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি হলে ৯ টাকা ১৪ পয়সা এবং ১২৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলে ৯ টাকা ২৭ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে বিইআরসি টেকনিক্যাল কমিটি ২ টাকা ৯৯ পয়সা বা প্রায় ৫৮ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
৪ ঘন্টা ৩৪ মিনিট আগে
৪ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে
৫ ঘন্টা ৩২ মিনিট আগে
৬ ঘন্টা ৪৫ মিনিট আগে
১ দিন ১ ঘন্টা ৩৫ মিনিট আগে
১ দিন ১৮ ঘন্টা ৪৫ মিনিট আগে
১ দিন ২১ ঘন্টা ৪৫ মিনিট আগে
১ দিন ২২ ঘন্টা ৫৯ মিনিট আগে