প্রকাশের সময়: 26-03-2025 10:16:14 pm
চা একটি প্রাচীন এবং সর্বজনীন পানীয়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তার নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। বাংলাদেশে চা এর উপভোগ এক ঐতিহ্যগত রীতিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের চা চাষ এবং চা বাগানগুলি ইতিহাস, শিল্প এবং অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
চা, শুধুমাত্র একটি পানীয় হিসেবে নয়, এটি সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও চিহ্নিত। রাস্তায় পথে পথে চা বিক্রেতাদের ছোট্ট চায়ের দোকানগুলো মানুষের দিনযাপনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। সকালে বা বিকেলে এক কাপ চা পান যেন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এক কাপ চা যেন নিয়ে আসে তৃপ্তির সতেজতা কাটিয়ে তোলে অলসতা।
এমনই এক তৃপ্তির নাম মধু খালার চা। টাংগাইলে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ম গেট সংলগ্ন ভগ্ন একটি চায়ের দোকান যা এক নামে মধু খালার চায়ের দোকান হিসাবে পরিচিত সবার কাছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এলাকাবাসীর কাছেও এই নামেই দোকানটি পরিচিতি লাভ করেছে। এই নামের পিছনে লুকায়িত আছে একটি মাধুরী মাখা ইতিহাস।
মধু খালা নামে পরিচিত থাকলেও তার নাম ছিলেন জোৎস্না বেগম। শিক্ষার্থীরা তার কাছে প্রায়ই চা খেতে যেতেন। তিনি চায়ে সবসময় অনেক বেশি চিনি দিতেন ফলে চা হয়ে যেত অতিরিক্ত মিষ্টি।
শিক্ষার্থীরা চিনি কম দেওয়ার কথা বললেও তিনি শুনতেন না কারো কথা। বলতেন তোমরা আমার ছেলে-মেয়ের মত তাই ভালোবেসে চিনি বেশি দেই।অতিরিক্ত চিনি দেওয়ার ফলে চা হয়ে যেত মধুর মত মিষ্টি এইজন্য শিক্ষার্থীরা তাকে ভালোবেসে মধু খালা নামে ডাকতে থাকেন। ধীরে ধীরে সবার কাছে মধু খালা হিসাবে পরিচিত লাভ করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়সহ এলাকাবাসীরাও তাকে এই নামে ডাকতে থাকেন। শিক্ষার্থীদের সাথে মধু খালার সম্পর্ক ছিল আপন ছেলে-মেয়ের মত। শিক্ষার্থীরাও মধু খালাকে অনেক বেশি আদর করতেন মাঝে মাঝে ছোটখাটো কিছু উপহারও দিতেন তাকে।
সবার প্রিয় মধু খালা এখন আর বেচে না থাকলেও রয়ে গেছে তার সেই স্বপ্নের দোকান সেই দোকান।
২০২২ সালের শেষের দিকে তিনি সবাইকে বিদায় দিয়ে চলে যান। তার রিক্সাচালক স্বামী হারান মোল্লা মারা যান প্রায় ১৯ বছর আগে। ৪ ছেলে ১ মেয়ের সংসারে এই দোকানের হাল ধরেন মধু খালার মেয়ে রমিছা বেগম। রমিছা বেগমের স্বামী আলমগীর হোসেন পেশায় একজন রিক্সাচালক। তাদের সংসারে নেই কোন ছেলে-মেয়ে। চায়ের দোকান থেকে যা আসে তা দিয়েই পার হয়ে যায় তাদের দিন। রমিছা বেগম জানান মাসে ১৫-২০ হাজার টাকার চা বিক্রি করলে ৫- ৬ হাজার টাকা হাতে থাকেন যা দিয়েই চলে তাদের সংসার।
মধুর খালার চায়ের মমতা নেয়নি এইরকম শিক্ষার্থী খুজে পাওয়া দায়। মধুর খালার চায়ের মমতা নিয়ে কথা বলেছেন অর্থনীতি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী প্রত্যাশা ভৌমিক পৃথা। পৃথা বলেন, " ক্লাসের ফাঁকে, পরীক্ষা শেষের স্বস্তিতে কিংবা যেকোনো অজুহাতে বন্ধুদের সাথে আড্ডার কথা এলেই আমাদের মধু খালার চায়ের দোকানই হয়ে ওঠে সবার প্রিয় জায়গা। এখানে চা-এর কাপ হাতে নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।রাজনীতি, সাহিত্য, সিনেমা, প্রেম, কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কোনো কিছুই বাদ যায় না। বিশেষ করে সন্ধ্যাবেলায়,চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কখন যে সময় গড়িয়ে যায় বন্ধুদের সাথে টেরই পাওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সেরা সময়গুলো কেটে যায় এমন আড্ডায়। পরীক্ষার চাপ ভুলে কয়েক মুহূর্তের জন্য প্রাণ খুলে হাসার জায়গা এটি।
সবচেয়ে দারুণ বিষয় হলো, এখানে শুধু বন্ধুরাই নয়, সিনিয়র-জুনিয়র থেকে শুরু করে শিক্ষকরাও মাঝে মাঝে যোগ দেন, যা এই আড্ডাকে আরও সমৃদ্ধ করে। জ্ঞানের আদান-প্রদান, ভবিষ্যৎ নিয়ে দিকনির্দেশনা, কিংবা নিছক কিছুক্ষণ আনন্দ—সবই এখানে মিশে থাকে। এই চায়ের দোকান কেবল একটি দোকান নয়, বরং এটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ, যা সবার মনে দীর্ঘদিন জায়গা করে নেবে।"
গণিত তৃতীয় বর্ষের মিজানুর রহমান ইমন বলেন, ক্লাসের ফাঁকে বা বিকেলের ফ্রি সময়ে বন্ধুদের আড্ডা জমাতে হলে, মধু খালার চায়ের বিকল্প নেই। কোথায় বসবো? এই প্রশ্ন উঠতেই সবার মুখে একসঙ্গে আসে "মধু খালা।"
তার চায়ের স্বাদ যেমন অনন্য, মানুষ হিসেবেও তিনি তেমনই অসাধারণ। স্নেহভরা হাসি, আন্তরিক আচরণ, আর চায়ের সেই চিরচেনা স্বাদ—সব মিলিয়ে মধু খালার দোকান যেন শুধু একটা চায়ের টং নয়, বরং আড্ডার এক অমূল্য ঠিকানা।"
হিসাববিজ্ঞান দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মির্জা তারেক বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত জীবন, ক্লাসের দৌড়ঝাঁপ, অ্যাসাইনমেন্টের চাপে হাঁসফাঁস করা দিনের মাঝেই যেন একটুখানি স্বস্তির জায়গা মধু খালার চায়ের দোকান। ৫নং গেটের পাশেই ছোট্ট টিনের ছাউনির সেই দোকানটা যেন শুধুই চায়ের জন্য নয়, এটা একটা আবেগের নাম। সকাল থেকে সন্ধ্যা যখনই যাবেন দেখবেন কোনো না কোনো চেনা মুখ বসে আছে, হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। ক্লাসের ফাঁকে গরম এক কাপ দুধ চা সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে জীবনের হাজারো গল্প, সব কিছুরই স্বাক্ষী মধু খালা। মধু খালা শুধু দোকানদার নন, তিনি যেন পুরো ক্যাম্পাসের সবার প্রিয় এক মানুষ। মন খারাপ থাকলে মিষ্টি হেসে বলেন, "এই নেন এক কাপ চা, সব ঠিক হয়ে যাবে।" তার হাতে বানানো সেই আদা-লেবু চা যেন যাদুর মতো সব ক্লান্তি দূর করে দেয়। বন্ধুদের সঙ্গে বসে চায়ের কাপ হাতে রোজকার গল্প, ভবিষ্যতের স্বপ্ন আর মাঝেমধ্যে একটু হতাশা—এসবেরই মিলনস্থল মধু খালার দোকান। সময় বদলাবে, ব্যাচের পর ব্যাচ পেরিয়ে যাবে, কিন্তু মধু খালার সেই হাসিমুখ আর সেই চায়ের স্বাদ তা চিরদিন থেকে যাবে হাজারো শিক্ষার্থীর মনে মিষ্টি এক স্মৃতি হয়ে।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও সহকারী প্রক্টর মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, "খালার দোকানে গিয়েছি এবং চা খেয়েছি অনেকবার। অনেক ভালো মানুষ উনি। দোয়া করি উনার জন্য।"
অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মো. তুহিন আহমেদ বলেন, "প্রায়শই সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসে হাঁটতে বের হই। হাঁটা শেষে এক কাপ রং চায়ের নেশায় পঞ্চম গেট সংলগ্ন মধুখালার দোকানের সামনে চেয়ারে বসে পড়ি। পরক্ষণেই দেখি, আমার শিক্ষার্থীরাও সেখানে হাজির। এরপর তাদের সাথে জমে উঠে চায়ের আড্ডা। আমি দেখি, আমার শিক্ষার্থীরা চায়ের আড্ডায় মন খুলে অনেক কথা বলতে পারে। আমি যতটা না উত্তর দেই, তার চেয়ে বেশি তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনি। শিক্ষার্থীদের সাথে মধুখালার দোকানে চা আড্ডা আমি খুব এনজয় করি। চায়ের স্বাদ যেমনই হোক, এই ঠিকানায় মিলে প্রাণের স্পন্দন।"
মধু খালার চা যেন মায়া, মমতা, স্নেহ, ও আবেগে ভরা এক শিল্পের নাম। যার মায়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন শিক্ষার্থীরা। এ মমতা যেন শেষ হবার নয়।
১৩ ঘন্টা ৯ মিনিট আগে
১ দিন ৮ ঘন্টা ১৫ মিনিট আগে
১ দিন ১৩ ঘন্টা ৯ মিনিট আগে
১ দিন ১৩ ঘন্টা ৩৯ মিনিট আগে
৫ দিন ৫ ঘন্টা ৫১ মিনিট আগে
৫ দিন ১০ ঘন্টা ৪১ মিনিট আগে
৫ দিন ১৬ ঘন্টা ২২ মিনিট আগে
৬ দিন ১৬ ঘন্টা ৪৪ মিনিট আগে