◾মিনহাজুল ইসলাম
পৃথিবীতে মানবেতিহাসের শুরু থেকেই শোনা যায় পোশাকের ব্যবহারের কথা। একাধিক ধর্মগ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী আদি মানব আদম ও হাওয়ার সময় থেকেই পোশাকের ব্যবহারের কথা জানা যায়। যদিও তারা স্বর্গীয় জীবন থেকে নির্বাসিত হয়ে আসার পর প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত গাছের পাতা, ছাল, বাকল ইত্যাদির সাহায্যে শরীর আচ্ছাদন করতেন। তবে সৃষ্টিকর্তা তাদের ক্ষমা করার পর থেকে তারা সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে পোশাকসহ জীবনধারণের সামগ্রী প্রাপ্ত হন। এসব নানা বর্ণনা কুরআন, বাইবেল ও ইহুদিদের তোরাহ বা ওল্ড টেস্টামেন্টে পাওয়া যায়। যদিও অনেক দার্শনিক অন্যভাবেও মত দিয়েছেন। তবুও পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাস বা ধারণা এমনটাই।
কালের বিবর্তনে আদম হাওয়ার সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি পৃথিবী। ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে তাদের বংশধরেরা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকাসহ পৃথিবীর নানাপ্রান্তে। এরইমাঝে সৃষ্টি হয় নানা জাতি। অনেকে আবার বিছিন্ন হয়ে যায় মূলধারা থেকে৷ জীবনধারণের জন্য বেছে নেয় গুহা বা জঙ্গলকে। ইতিহাস কিংবা সামাজিক বিজ্ঞানের গ্রন্থ থেকে জানা যায়, এভাবেই জঙ্গল বা গুহাবাসী মানুষেরা বেছে নেয় পশু শিকার, পাখি শিকার সহ জীবিকার নানাপথ। বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে জানা যায়, এভাবেই মূলধারার সভ্যতার বাইরের অনেক অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মাঝে তখন পোশাকের সংস্কৃতি খুব একটা ছিল না। তারা অর্ধ বিবস্ত্র হয়েই বনে জঙ্গলেই বসবাস করতো। আবার অনেক জাতির লোকেরা গাছের পাতা দিয়ে কেবল লজ্জাস্থানটাই আবৃত রাখতো। পোশাক বলতে তারা শুধু লজ্জাস্থান ঢাকাটাই বুঝতো। ধীরে ধীরে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠে বিভিন্ন সভ্যতা। আবিষ্কার হয় বিভিন্ন নিত্য নতুন জিনিস। মানুষ এগিয়ে যায় শিল্পে, কৃষিতে। প্রচলন হয় নানা সৌন্দর্যমণ্ডিত পোশাকের। মানুষ তুলা, রেশম, পাট ইত্যাদি চাষের মাধ্যমে তৈরি করে সুতা, আর সুতা থেকে নানা পোশাক। এভাবেই পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে নানা পোশাকের সমাহার। ধীরে ধীরে সব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে সভ্যতা। বন জঙ্গলে বসবাস করা শিকারী জনগোষ্ঠীও সমাজবদ্ধ সভ্য জীবনযাপনে আগ্রহী হয়।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা বোঝাই যায় যে, পোশাকহীনতা বা শুধু লজ্জাস্থান ঢাকাটা মূলত আদিম বন জঙ্গলের মানুষের সংস্কৃতি ছিল। দিনে দিনে মানুষ যতটা সভ্য হয়েছে ততটাই শালীন ও মার্জিত হয়েছে। পোশাকের সৌন্দর্যে সবাই চেয়েছে নিজেকে আকর্ষণীয় করতে।
কিন্তু ইদানীংকালে আমরা দেখছি আধুনিকতার নামে একদল লোক সেই আদিম বা জঙ্গলবাসী মানুষদের সংস্কৃতিতে ফিরে যেতে অতি উৎসাহী৷ বিশেষত পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশেই এখন দেখা দিয়েছে এজাতীয় নানা অপসংস্কৃতি। পোশাকহীনতা, চলচ্চিত্রে নগ্নতা, এমনকি পর্নোগ্রাফি, সঙ্গীতে অশ্লীলতাসহ এমনসব লজ্জাহীনতা পশ্চিমাবিশ্বের সর্বত্রই ছেয়ে গেছে। শুধু এখানেই নয় পশ্চিমা বিশ্বের দেশে দেশে এখন আইন করে বৈধতা দেয়া হচ্ছে সমকামিতাকে। আবার গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ডের সংস্কৃতিতে তারা এখন বিয়ে ছাড়াই সন্তান জন্ম দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে পশ্চিমা সমাজ ও পারিবারিক জীবনে নেমে এসেছে নানা অশান্তিও। তবুও পশ্চিমাদের নিয়ে আমাদের মাথা না ঘামালেও চলতো। কিন্তু লক্ষণীয় হলো, পশ্চিমাদের এসব অপসংস্কৃতি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে আমাদের উপমহাদেশে বিশেষত বাংলাদেশে ঢুকানো হচ্ছে। এই বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতিকে কবর দিয়ে এখানে পশ্চিমা নোংরা সংস্কৃতির মহিমা খুব প্রচার করা হচ্ছে। দিনকে দিন মিলিয়ে যাচ্ছে এদেশের হাজার বছরের সেই বাউল গান, মরমি গান, রবীন্দ্র সঙ্গীত আর নজরুলের ধর্মীয় সঙ্গীতের মূর্ছনা। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে ঢুকছে ভিনদেশি সংস্কৃতি আর ভাষার গান ও চলচ্চিত্র। এসব চলচ্চিত্র বা সংস্কৃতিতে বলীয়ান হয়ে আজ একদল লোক পোশাকের স্বাধীনতার কথা বলতে বলতে নিজেদের অজান্তেই অনেকটা পশুসমাজের পর্যায়ে নেমে গিয়েছেন। গণতান্ত্রিক দেশে চলাফেরা, পোশাক-আশাক ইত্যাদির স্বাধীনতা হয়ত চাওয়া যেতেই পারে। কিন্তু একটা জিনিস ভুলে গেলে চলবেনা, তাহলো- মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তাই কেবল লজ্জাস্থানটা আবৃত করে অন্যসব অনাবৃত রেখেই চলাফেরার স্বাধীনতা চাওয়াটা নিশ্চয়ই বিকৃত মানসিকতার লোকেদের কাজ। রাস্তার পাগল বা পাগলিটাও নিশ্চয় শুধু লজ্জাস্থান ঢেকেই ক্ষান্ত হতে চাইবেনা। সেও চাইবে শরীরের ন্যূনতম একটা অংশ ঢেকে রাখতে। কেউ তার পোশাক কেড়ে নিতে চাইলে সেও হয়ত চিৎকার করে উঠবে। কেননা, পাগলও এতটা পাগল নয় যে একবারে নগ্ন হয়ে থাকবে। কিন্তু সেই পাগল কারা, যারা বিকিনি নামক অতি ক্ষুদ্র লজ্জাস্থান আবৃতকারী একটি জিনিস পরিধান করে বাইরে চলাফেরার স্বাধীনতা চাইতে গিয়ে ক্রুসেড ঘোষণা করেছে? সেই পাগল কারা, যারা বিকিনি পরিহিতাদের অভিনয় করা চলচ্চিত্রের প্রচার প্রসারে তৎপর? এই বিকিনিতে লজ্জাস্থান ও তৎসংশ্লিষ্ট অঙ্গগুলোও সম্পূর্ণরূপে আবৃত হয়না৷ তাহলে এগুলো পরে বাইরে চলাচলের মাধ্যমে কি তারা আবারও মানবসমাজকে আদিম জঙ্গলবাসী পোশাকহীন সমাজে পরিণত করতে চায়? তারা মূলত আধুনিকতার দোহাই দিয়ে এসব জিনিসকে উচ্চতর সংস্কৃতি বলে দাবি করে থাকে। তাহলে বলতেই হয়, তবে কি আদিমরাই বেশি আধুনিক ছিল?
এ প্রসঙ্গে যদি প্রশ্ন করি মানুষ কেন পোশাক পরে? উত্তর হতে পারে কয়েক রকম। একটা হলো- মানুষ লজ্জাস্থান ঢাকার জন্য পোশাক পরে। কেবল এই উদ্দেশ্যেই পোশাক পরার চল যেমন প্রাচীন জঙ্গলবাসী মানুষদের মধ্যে ছিল, তেমনই এই আধুনিক বিশ্বের আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বেশকিছু দুর্গম জঙ্গলে এমন কিছু উপজাতি পাওয়া যাবে, যারা কেবল লজ্জাস্থান ও তৎসংশ্লিষ্ট অঙ্গ ঢাকার মতো পোশাক পরেই সন্তুষ্ট থাকে। আবার পোশাক পরার উদ্দেশ্য যদি হয় শালীনতা। তাহলে বোঝা যায়, সেই পোশাক দ্বারা পুরুষ ও নারীরা নিজেদের শরীরের অধিকাংশ জায়গা ঢেকে রাখতে চায়। এছাড়াও পোশাক পরার উদ্দেশ্য যদি হয় সাজসজ্জা। তাহলে উঠে আসবে নানা রংবেরঙের পোাশাক পরিচ্ছদের কথা। তবে যারা বিকিনি পরার স্বাধীনতার কথা বলেন তারা কি এই আধুনিক সভ্যতার যুগেও শুধুই লজ্জাস্থান ঢাকার উদ্দেশ্যেই পোশাক পরতে চান? তাহলে সেই প্রাচীন বনবাসী মানুষ কিংবা বর্তমান বিশ্বের আফ্রিকার জঙ্গলে বাস করা সেসব উপজাতিদের পোশাক পরার উদ্দেশ্যের সাথে তাদের পোশাক পরার উদ্দেশ্যের পার্থক্যটা থাকলো কী? আর এতটা কম পোশাক পরে কীভাবে তারা আধুনিক ও সভ্য হতে চায়, তা সত্যিই বড় রহস্যময় প্রশ্ন।
তবে কি আধুনিকতার বুলির আড়ালে একদল ষড়যন্ত্রকারীরা এদেশের নারীদের নগ্ন করে পণ্যে পরিণত করার গভীর চক্রান্তে লিপ্ত? যদি পোশাকহীনতা কারো কাছে অনেক বেশি প্রিয় হয়, তাহলে সে সেটার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতেই পারে। কিন্তু কেন এসব পোশাকের স্বাধীনতার নামে এত আন্দোলন আর মানববন্ধন? কেন পোশাক নিয়ে উচ্চ আদালতের একটি গঠনমূলক মন্তব্যকে অবমাননা করে এত বেশি চিল্লাপাল্লা? নিশ্চয়ই সেগুলো ভাবার সময় এসেছে। এখনই যদি বাঙালিরূপী এসব পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রচারকদের আদর্শিকভাবে প্রতিহত না করা যায় তবে অচিরেই হারিয়ে যাবে আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। আমরা হয়ে পড়বো আত্মভোলা, শেকড়হীন এক জাতি। আশাকরি সেই দিন দেখার আগেই উন্নতি হবে বাংলার মানুষের চিন্তাধারার। আঁকড়ে ধরবে নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। রক্ষা পাবে বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য ও শালীন সংস্কৃতি।
লেখক : মিনহাজুল ইসলাম
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
৫ দিন ২২ ঘন্টা ৪৬ মিনিট আগে
৬ দিন ২২ ঘন্টা ৩২ মিনিট আগে
৬ দিন ২২ ঘন্টা ৩৪ মিনিট আগে
১২ দিন ৩ ঘন্টা ৩ মিনিট আগে
১৩ দিন ২২ ঘন্টা ৫৮ মিনিট আগে
১৩ দিন ২২ ঘন্টা ৫৯ মিনিট আগে
১৭ দিন ১৯ ঘন্টা ২৯ মিনিট আগে
১৮ দিন ৩ ঘন্টা ৫৯ মিনিট আগে