জোছনার আলোয় পড়া সেই মেয়েটি আজ সফল উদ্যোক্তা (রুবা) শারমিনের প্রেরণাদায়ী যাত্রা
রুবা শারমিন একজন সহজ-সরল, বিনয়ী ও সৎ মনের মানুষ। সবসময় হাস্যোজ্জ্বল এই নারী শুধু নিজের জীবনের জন্য নয়, সমাজের জন্যও এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। যশোরের মেয়ে রুবা বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করছেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও পরিশ্রমী, জীবনের প্রতিটি ধাপে নিজের যোগ্যতা ও সততার পরিচয় দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি রয়েছেন Royal TV Limited-এর Vice Chairman পদে, যা নিঃসন্দেহে তার জীবনের এক অসাধারণ সাফল্য। পাশাপাশি একজন Digital Creator হিসেবেও রুবা শারমিন নিজের সৃজনশীলতা ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনন্য পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। তিনি Govt. B.L University College, Khulna থেকে শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেছেন। একজন শিক্ষার্থী হিসেবেও ছিলেন আদর্শ, পরিশ্রমী ও নিষ্ঠাবান।
শৈশবের সংগ্রাম ও স্মৃতি
রুবা শারমিন বলেন,
“আমি যশোরের মেয়ে। আমার লেখাপড়া যশোর ও খুলনাতেই। বড় বোন খুলনায় থাকতেন, তাই আমি বেশিরভাগ সময় তার বাসাতেই বড় হয়েছি। আমরা পাঁচ বোন ও এক ভাই — বাবা ছিলেন আর্মিতে, কিন্তু আমি বাবাকে তেমন একটা দেখিনি। নানির বাড়িতেই বড় হয়েছি। নানির খুব কঠোর নিয়ম ছিল রাত আটটার পর লাইট জ্বালানো যেত না। তখন জোছনার আলোয় পড়াশোনা করতাম। সারা রাত ফ্যান চালানোও নিষেধ ছিল, কারণ নানিকে কেউ বলেছিল জোরে ফ্যান চললে নাকি বিদ্যুতের বিল বেশি আসে। গরমে কষ্ট হলেও সেই নিয়ম ভাঙিনি।”
তিনি আরও স্মৃতিচারণ করে বলেন,
“আমাদের সংসারে ছিল সীমিত সামর্থ্য। অল্প মুড়িও মা আমাদের ছয় ভাইবোনকে ভাগ করে দিতেন। আমরা জিজ্ঞাসা করতাম, ‘আপনি খাবেন না?’ — মা বলতেন, ‘আমার পেট ভরা।’ আজ বুঝি, আসলে তখন তার পেট ভরা ছিল না, তবুও আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যই বলতেন।”
রুবার পারিবারিক ইতিহাসও সমৃদ্ধ। তার বাবার পরিবার সৈয়দ বংশের, আর তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন ব্রিটিশ আমলের জমিদার। এখনো তার দাদার নামে প্রতিবছর বড় ওরস অনুষ্ঠিত হয়। তার নানার বাবা ছিলেন সেই সময়ের ডার্জিলিং চা-বাগানের ম্যানেজার, আর নানা ছিলেন যশোরের প্রথম শাড়ির কনট্রাক্টর।
তবে পরিবারের ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও, জীবনে তিনি দেখেছেন অগণিত কষ্ট ও সংগ্রাম। রুবা বলেন,
“আমরা নয় ভাইবোন ছিলাম। তিন ভাই মারা যাওয়ার পর এখন শুধু এক ভাই আছে। আমাদের বড় ভাই হেলাল ভাই ছিলেন আমাদের সংসারের ভরসা, আমাদের বাবার মতো। তিনি নিজের পড়াশোনা থামিয়ে আমাদের মানুষ করার দায়িত্ব নেন। ভাইয়া বিয়ে করেছিলেন আমাদের খালাতো বোনকে, তাদের কন্যা দোলন জন্ম নেয়। কিন্তু যখন দোলনের বয়স মাত্র দেড় বছর, তখন ভাইয়া রোড এক্সিডেন্টে মারা যান। তার মৃত্যুর পর যেন আবার আমাদের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে।”
তিনি আরও জানান,
“ভাইয়া মৃত্যুর আগে অনেক বড় ব্যবসা গড়ে তুলেছিলেন, যশোরে সবাই তাকে চিনত। কিন্তু ভাইয়া চলে যাওয়ার পর, তার পরিশ্রমের ফলও আমরা ধরে রাখতে পারিনি সবাই আমাদের ঠকিয়েছিল। আবার আমরা সেই আগের মতো, বাবা-বিহীন, কষ্টের জীবনে ফিরে যাই। সেখান থেকেই আমার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু।”
অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প
আজ সেই কষ্টের অতীত পেরিয়ে, নিজের পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে রুবা শারমিন পৌঁছেছেন সাফল্যের শিখরে। নিজের সংগ্রামের গল্প দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন — নারী ইচ্ছা ও অধ্যবসায়ে যেকোনো বাধা জয় করতে পারে।
রুবা শারমিন শুধু একজন নারী উদ্যোক্তা নন তিনি একজন প্রেরণা, উদাহরণ ও মানবিক মুখ, যিনি হাসিমুখে নিজের আলোকিত পথ দিয়ে অন্যদের জীবনে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন।