ক্যালেন্ডারের পাতায় উৎসবের লাল তারিখটি যত ঘনিয়ে আসে, ঢাকা শহরের ব্যস্ততায় তত যেন ক্লান্তি বাড়ে। কিন্তু এই ক্লান্তির তলায় থাকে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। অবশেষে যখন সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি আসে, শহরটা যেন দম ছেড়ে বাঁচে। ভোরবেলার কুয়াশাচ্ছন্ন রাজপথে আজ আর সেই চিরচেনা যানজট নেই। নেই হর্নের কর্কশ শব্দ, নেই ট্রাফিক পুলিশের ঘর্মাক্ত হাতের সংকেত। মেট্রো রেলের স্টেশনগুলো সুনসান, বাসের জানালা দিয়ে আসা বাতাস আজ ভারমুক্ত। শহরটা আজ বড্ড একা। এক অজানা, অদৃশ্য বাঁশির সুর সবাইকে ডেকে নিয়ে গেছে তার আপন ঠিকানায়। যখন ঢাকা শহরটা হয়ে আছে শুধু ইট-পাথরের এক বিশাল কঙ্কাল, কারণ তার প্রাণভোমরা আজ ছুটছে নীড়ের সন্ধানে।
এই 'নীড়'
বা 'শেকড়'
জিনিসটি ঠিক
কী? এটি
কেবল একটি
গ্রামের নাম,
বা একটি
নির্দিষ্ট বাড়ি
নয়। এটি
মূলত স্মৃতি,
সম্পর্ক আর
ভালোবাসার এক
অদৃশ্য শিকড়,
যা আমাদের
মাটির সাথে
বেঁধে রাখে।
বছরের তিনশ
পঞ্চাশ দিন
আমরা ঢাকাকে
'নিজের শহর'
বলে দাবি
করি। আমরা
এই শহরের
সুযোগ-সুবিধা
উপভোগ করি,
এর ধুলো-বালি-কাদা
মাখি, এর
প্রতিযোগিতায় শামিল
হই। কিন্তু
উৎসবের সময়ে
এই শহরের
মোহ যেন
কর্পূরের মতো
উবে যায়। বাস
টার্মিনাল, ট্রেন
স্টেশন বা
লঞ্চ ঘাটে
তখন ভিন্ন
চিত্র। হাজারো
মানুষের ভিড়।
সবার মুখে
ক্লান্তির ছাপ,
কিন্তু চোখে
এক অদম্য
আনন্দ। এক
হাত দিয়ে
ব্যাগ সামলাচ্ছেন,
অন্য হাত
দিয়ে ছোট
সন্তানকে শক্ত
করে ধরে
আছেন এক
মা। বাবা
তার ট্রাঙ্কটা
কোনোমতে বাসের
ছাদে তোলার
জন্য প্রাণপণ
চেষ্টা করছেন।
ট্রেনের জানালার
পাশে বসার
জন্য চলছে
নীরব যুদ্ধ।
কোনোমতে বাসের
টিকেট জোগাড়
করে, ভিড়
ঠেলে ভেতরে
ঢোকার পর
যে স্বস্তির
শ্বাস, তা
বোধহয় পৃথিবীর
আর কোনো
আরামদায়ক বিছানায়
পাওয়া সম্ভব
নয়। কেন এই
পাগলামি? কেন
এত ভোগান্তি
সত্ত্বেও মানুষ
বারবার এই
পথে নামে?
এর উত্তর
লুকিয়ে আছে
'নাড়ির টানে'। গ্রামে অপেক্ষা
করে আছে
বৃদ্ধ মা,
যার ঝাপসা
চোখ প্রতিবার
দরজার দিকে
চেয়ে থাকে।
অপেক্ষা করে
আছে ছোট
ভাই, যে
নতুন জামাটার
জন্য সারাবছর
অপেক্ষা করেছে।
অপেক্ষা করে
আছে সেই
পুকুরঘাট, যেটাতে
সাঁতার কেটে
শৈশব কেটেছে।
এই মানুষগুলো
এবং এই
স্মৃতিগুলোই হলো
আসল নীড়।
শহরের চাকচিক্য
এদের তুলনায়
ম্লান। বাড়ি ফেরার
পথ কখনোই
মসৃণ হয়
না। বিশেষ
করে উৎসবের
সময়ে তা
হয়ে ওঠে
এক দুঃস্বপ্ন।
মহাসড়কে মাইলের
পর মাইল
যানজট, ফেরিঘাটে
ঘণ্টার পর
ঘণ্টা অপেক্ষা,
কিংবা লঞ্চের
ছাদে জায়গা
পাওয়ার সংগ্রাম-সবই যেন
এই যাত্রার
অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অনেক সময়
টিকেট কালোবাজারিদের
কবলে পড়ে
দ্বিগুণ দাম
গুনতে হয়।
বাস বা
ট্রেনের অস্বস্তিকর
যাত্রা, গরম,
আর ধুলোবালির
মধ্যে সময়
পার করা
কম কষ্টের
নয়।
কিন্তু আশ্চর্যের
বিষয় হলো,
এই সব
ভোগান্তি যখন
প্রিয়জনের হাসিমুখের
সামনে পড়ে,
তখন তা
মুহূর্তেই বাষ্পীভূত
হয়ে যায়।
গ্রামের স্টেশনে
যখন ট্রেনটা
থামে, তখন
সেই পরিচিত
গন্ধ আর
পরিচিত মুখগুলো
সব ক্লান্তি
ভুলিয়ে দেয়।
বৃদ্ধ বাবা
যখন ছেলেকে
জড়িয়ে ধরেন,
বা ছোট
বোন যখন
ভাইয়ের হাতে
পায়েশ তুলে
দেয়, তখন
পথযাত্রার সব
কষ্ট ধুয়েমুছে
সাফ হয়ে
যায়। এই
আনন্দ ভাগাভাগি
করার কোনো
তুলনা নেই।
এই আনন্দের
জন্যই মানুষ
বারবার এই
ভোগান্তি মেনে
নেয়। মানুষ চলে
যাওয়ার পর
ঢাকা শহরটা
হয়ে ওঠে
বড়ই অচেনা।
যে রাস্তায়
চলাই দায়,
সেখানে আজ
ফুটবল খেলা
সম্ভব। যে
রেস্তোরাঁয় সিরিয়াল
দিয়ে খাবার
খেতে হয়,
সেখানে আজ
শুধু টেবিল-চেয়ার পড়ে
আছে। শহরের
নিরাপত্তা কর্মীরা,
ট্রাফিক পুলিশ,
আর কিছু
জরুরি পরিষেবার
কর্মীরাই শুধু
রাজপথে থাকেন।
তারা হয়তো
নিজেদের বাড়ি
যেতে পারেন
না, কিন্তু
অন্যদের নিরাপদে
পৌঁছাতে সাহায্য
করেন।এই
একাকীত্বের আড়ালে
লুকিয়ে থাকে
কিছু কঠিন
বাস্তবতাও। শহর
ছেড়ে যাওয়া
মানে শুধু
আনন্দ নয়,
এর সাথে
জড়িয়ে থাকে
অর্থনৈতিক লেনদেন।
শহর থেকে
উপার্জিত অর্থ
গ্রামে যায়,
গ্রামীণ অর্থনীতি
চাঙ্গা হয়।
কিন্তু অন্যদিকে,
উৎসবের পর
এই মানুষগুলো
যখন আবার
শহরে ফেরে,
তখন তারা
সাথে করে
নিয়ে আসে
এক নতুন
লড়াইয়ের প্রস্তুতি।
আবার সেই
যান্ত্রিকতা, আবার
সেই প্রতিযোগিতা।
এই চক্র
চলতেই থাকে। 'শহরটা
আজ বড্ড
একা, সবাই
ছুটছে নীড়ে'-এই লাইনটি
কেবল একটি
পরিস্থিতি বর্ণনা
করে না,
এটি মানুষের
ভালোবাসার এক
গভীর সত্যকে
ফুটিয়ে তোলে।
আমরা যতই
যান্ত্রিক হই,
যতই উন্নত
প্রযুক্তি ব্যবহার
করি, আমাদের
মন আজও
সেই মাটির
কাছাকাছি থাকতে
চায়। আমাদের
আনন্দ তখনই
পূর্ণতা পায়,
যখন আমরা
তা প্রিয়জনের
সাথে ভাগ
করে নিতে
পারি।
এই উৎসবগুলো
আসলে আমাদের
মনে করিয়ে
দেয়, মানুষের
আসল পরিচয়
তার সম্পদ
বা অবস্থান
নয়, বরং
তার সম্পর্ক
আর ভালোবাসা।
এই বাড়ি
ফেরার মধ্য
দিয়ে আমরা
আমাদের শেকড়কে
স্মরণ করি,
আমাদের পরিবারকে
সম্মান করি,
এবং আমাদের
মানবিক মূল্যবোধকে
পুনরুজ্জীবিত করি।
ঢাকাবাসী আজ
তাদের প্রিয়
শহরকে একা
রেখে চলে
গেছে, কিন্তু
তারা তাদের
মন রেখে
গেছে এক
গভীর ভালোবাসার
বন্ধনে। তারা
যখন ফিরবে,
তখন তারা
সাথে করে
নিয়ে আসবে
নতুন শক্তি,
নতুন আশা,
এবং সেই
পরিচিত হাসিমুখগুলো।
আর ততক্ষণ
পর্যন্ত, ঢাকা
শহরটা শুধু
একটা ইট-পাথরের কঙ্কাল
হয়ে অপেক্ষা
করবে তার
প্রাণভোমরাদের ফেরার।
৪ ঘন্টা ৫৩ মিনিট আগে
৯ ঘন্টা ৭ মিনিট আগে
৯ ঘন্টা ৪৮ মিনিট আগে
১০ ঘন্টা ১৮ মিনিট আগে
১১ ঘন্টা ২ মিনিট আগে
১ দিন ৭ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে
১ দিন ৮ ঘন্টা ৫ মিনিট আগে
১ দিন ৯ ঘন্টা ১৬ মিনিট আগে