টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়। লাল মাটির এই উঁচু-নিচু টিলা আর শাল-গজারির নিবিড় অরণ্য একসময় ছিল প্রাণবৈচিত্র্যের স্বর্গরাজ্য। এই বনের আনাচে-কানাচে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠত নানা পদের বুনো ফল। তার মধ্যে অন্যতম এবং সম্ভবত সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল দেশি বেত এবং এর থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা মুক্তোর মতো সাদাটে বেতফল। কিন্তু কালের আবর্তে, বনভূমি উজাড় আর আধুনিক কৃষির আগ্রাসনে মধুপুর গড়ের সেই আদি বেতবন আজ ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে বসেছে। হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শৈশবস্মৃতি মাখা টক-মিষ্টি স্বাদের সেই বুনো ফল। এই ফলকে বিভিন্ন ভাবে চিনে থাকেন যেমন বেত গাছের ফলকে বেতফল, বেত্তুন, বেথুন, বেথুল, বেতুল, বেতগুলা, বেতগুটি, বেত্তুইনটি ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। বেতগাছের বৈজ্ঞানিক নাম Calamus tenuis, যা Arecaceae। এটি বাংলাদেশ, ভুটান, কম্বোডিয়া, লাওস, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত, জাভা ও সুমাত্রা অঞ্চেল পাওয়া যায়। বেতফল একটি বুনো ফল। এটি কণ্টকাকীর্ণ বা কাঁটায় ছাওয়া বেত গাছে থোকায় থোকায় ফলে। দেখতে অনেকটা ছোট মার্বেলের মতো, কাঁচা অবস্থায় সবুজ আর পাকলে ধবধবে সাদা বা ঈষৎ হলদেটে হয়। ফলের ওপরের আবরণটি পাতলা আঁশের মতো, যা ছাড়িয়ে ভেতরের কষযুক্ত শাঁসটি খেতে হয়। এর স্বাদ টক-মিষ্টির এক অদ্ভুত মিশ্রণ। মধুপুর গড়ের আদিবাসীদের কাছে বেতগাছ কেবল ফলের উৎস নয়, বরং জীবিকার বড় অবলম্বন ছিল। ঘায়রা গ্রামের নিশি ম্রং(৩০) প্রতিদিনের ন্যায় পাহাড়ের পাতদেশে যেয়ে এই বেতফল সংগ্রহ করে দোখলা পিকনিক স্পটে দর্শনার্থীদের কাছে বিক্রি করে সংসার চালান। বেত গাছ দিয়ে গোলাকার লাঠি ও বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে বিক্রি করে। তিনি আরো বলেন বেত দিয়ে তৈরি হতো ঘরের বেড়া, ঝুড়ি, কুলা, ধামা এবং আসবাবপত্র। একসময় এই গড়ের শালবনের ভেতরে প্রচুর পরিমাণে দেশি বেতগাছ পাওয়া যেত। বর্ষার শেষে যখন বনের ঝোপঝাড়ের আড়ালে থোকায় থোকায় বেতফল উঁকি দিত, তখন এক অন্যরকম দৃশ্যের অবতারণা হতো। স্থানীয় শিশু-কিশোররা দল বেঁধে বনের গভীরে যেত এই 'প্রকৃতির মুক্তো' সংগ্রহ করতে।
মধুপুর গড়ের এই ঐতিহ্যবাহী ফলটি আজ কেন বিলুপ্তপ্রায়? এর পেছনে কাজ করেছে বহুমুখী কারণ রয়েছে। আবাসস্থল ধ্বংসে মধুপুর গড়ের শালবন আগের মতো অটুট নেই। বনের বড় বড় গাছ কাটার ফলে তার নিচে জন্মানো ছায়াপ্রিয় বেতবন সূর্যের প্রচন্ড তাপে শুকিয়ে যাচ্ছে। আদি বন উজাড় ও বাণিজ্যিক বাগান তৈরি। একসময় যেখানে প্রাকৃতিকভাবে বেত ও অন্যান্য বুনো গাছ জন্মাত, সেখানে এখন আনারস, কলা বা পেঁপের মতো বাণিজ্যিক চাষাবাদ হচ্ছে। চাষের জমি বের করতে গিয়ে সবার আগে কাটা পড়ে কাঁটাভর্তি এই বেতগাছ। দীর্ঘ উৎপাদন চক্র একটি বেতগাছ ফল দেওয়ার উপযোগী হতে বেশ কয়েক বছর সময় নেয়। দ্রুত মুনাফার আশায় মানুষ আর এই বুনো ঝোপ সংরক্ষণ করতে আগ্রহী নয়। চাহিদার পরিবর্তন-আধুনিক প্রজন্মের কাছে বিদেশি দামি ফলের আধিক্য বুনো ফলের গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বাজারেও এখন আর আগের মতো বেতফলের দেখা মেলে না। বেতফল কেবল একটি ফল নয়, এটি ওষুধি গুণে সমৃদ্ধ। স্থানীয় কবিরাজি চিকিৎসায় হজমের সমস্যা দূর করতে এবং রক্তস্বল্পতা নিরাময়ে বেতফল ব্যবহৃত হতো। এ ছাড়া বেতগাছের কচি আগা বা 'বেত ডগা' শাক হিসেবেও বেশ জনপ্রিয়, যা শরীরের তিক্ততা দূর করতে এবং কৃমিনাশক হিসেবে কাজ করে। বাস্তুসংস্থানের দিক থেকেও বেতগাছের গুরুত্ব অপরিসীম। ঘন কাঁটাযুক্ত বেতবন বনের ছোট প্রাণীদের যেমন-বেজি, শিয়াল বা বুনো মুরগির জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। বেতবন হারিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো এই সব প্রাণীর নিরাপদ আবাসনও হারিয়ে যাওয়া।
বিট বন কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন বলেন-গায়রা এলাকায় দশ বিঘা জমির উপর বেত গাছ লাগনো হয়েছে যেখানে বন্য প্রাণিদের খাবারের জায়গায় হিসেবে বেচে নেয় এবং গারো সম্প্রদায়ের লোকেরাও জীবনজীবিকা নির্ভর করে থাকে। বর্তমানে মধুপুরের জাতীয় উদ্যান এলাকা ছাড়া সংরক্ষিত বনের বাইরে বেতগাছ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অথচ দুই দশক আগেও টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুই পাশে পসরা সাজিয়ে বেতফল বিক্রি করতে দেখা যেত। এখন সেই জায়গা দখল করেছে হাইব্রিড সবজি আর প্লাস্টিকের খেলনা। গড়ের প্রবীণরা আক্ষেপ করে বলেন, "আগে জঙ্গলে গেলে কাপড়ে কাঁটা আটকানো ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এখন সেই জঙ্গলও নেই, আর কাঁটাওয়ালা বেতও নেই।" বেতফল বা দেশি বেতকে হারিয়ে যেতে দেওয়া মানে আমাদের ঐতিহ্যের একটি অংশকে বিসর্জন দেওয়া। একে রক্ষায় কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সামাজিক বনায়নে অন্তর্ভুক্তিকরণে বন বিভাগ যদি কেবল বিদেশি ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণি না লাগিয়ে স্থানীয় জাতের বেত রোপণ করে, তবে বনের ভারসাম্য ফিরবে। চাষীদের উদ্বুদ্ধকরণ-বাণিজ্যিকভাবে বেত চাষের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা। বেতের আসবাবপত্রের চাহিদা বিশ্বব্যাপী, তাই ফল ও কাষ্ঠল সম্পদ-উভয় দিক থেকেই এটি লাভজনক। সচেতনতা বৃদ্ধি-পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই ফলের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ তুলে ধরা। মধুপুর গড়ের সেই হারিয়ে যাওয়া বেতবন কেবল বৃক্ষরাজি নয়, তা ছিল এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির অংশ। বনের নিস্তব্ধতায় শিশিরভেজা সাদা বেতফলের সেই অপরূপ সৌন্দর্য আজ স্মৃতিতে ধূসর হয়ে আসছে। আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তবে হয়তো খুব শীঘ্রই ডিকশনারি থেকে 'বেতফল' শব্দটি মুছে যাবে এবং আমাদের উত্তরসূরিরা জানতেই পারবে না মধুপুরের এই দুর্লভ সওগাতের কথা। প্রকৃতি আমাদের যা দিয়েছিল, অযত্ন আর অবহেলায় আমরা যেন তা চিরতরে হারিয়ে না ফেলি-এটাই হোক আজকের প্রার্থনা।
৪ ঘন্টা ৫৩ মিনিট আগে
৫ ঘন্টা ১০ মিনিট আগে
৫ ঘন্টা ৫৭ মিনিট আগে
৬ ঘন্টা ৪৭ মিনিট আগে
৬ ঘন্টা ৪৭ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ১৬ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ২৫ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ২৭ মিনিট আগে