◼️ মোঃ রাশেদ মিয়া : একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা যখন একটি 'স্মার্ট' ও সমৃদ্ধ আগামীর স্বপ্ন দেখছি, তখন আমাদের অন্দরমহলে হানা দিয়েছে এক ভয়াবহ নীরব ঘাতক—মাদক। এটি এমন এক মরণব্যাধি যা কোনো যুদ্ধ বা মহামারি ছাড়াই একটি প্রজন্মের প্রাণশক্তি শুষে নিচ্ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, মাদক আজ কেবল একটি ব্যক্তিগত বিচ্যুতি নয়, বরং এটি একটি জাতীয় ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংকট।বিভিন্ন গবেষণা ও গণমাধ্যমের তথ্যমতে, বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা এখন আশঙ্কাজনক। দেশে বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ (৮.২ মিলিয়ন) ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশই তরুণ। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩৩% মাদকসেবী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সেই প্রথম মাদকের স্বাদ নেয়। আর ৫৯% ক্ষেত্রে এই হাতেখড়ি হয় ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে। অর্থাৎ, উচ্চশিক্ষার সময়টাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। একজন মাদকসেবী মাসে গড়ে ৬,০০০ টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করে। জাতীয়ভাবে এই অর্থের পরিমাণ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা, যা মূলত অনুৎপাদনশীল এবং অপরাধমূলক খাতে প্রবাহিত হচ্ছে। দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা (৬০ লাখের বেশি ব্যবহারকারী), তবে এর পাশাপাশি ইয়াবা (২২.৯ লাখ), হেরোইন এবং সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত প্রাণঘাতী 'ক্রিস্টাল মেথ' বা 'আইস'-এর বিস্তার দশগুণ বেড়েছে। এর সাথে নতুন আপদ হিসেবে যুক্ত হয়েছে ট্যাপেন্টাডল ও প্রিগাবালিন-এর মতো জীবনরক্ষাকারী ওষুধের অপব্যবহার। ইয়াবার সহজলভ্যতা কমলে বা দাম বাড়লে আসক্তরা এই পেইনকিলারগুলোকে নেশার বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছে, যা দ্রুত তাদের কিডনি ও লিভার অকেজো করে দিচ্ছে।
অপরদিকে, জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩১৬ মিলিয়ন (৩১ কোটি ৬০ লাখ) মানুষ মাদক ব্যবহার করছে, যা মোট বৈশ্বিক জনসংখ্যার ৬ শতাংশ। গত এক দশকে মাদক ব্যবহারের হার প্রায় ২০% বৃদ্ধি পেয়েছে। সিন্থেটিক ড্রাগ বা কৃত্রিম মাদকের (যেমন: ফেন্টানিল, মেথামফেটামিন) উৎপাদন ও পাচার এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাদকের নতুন আতঙ্ক: প্রেসক্রিপশন ড্রাগের মরণনেশা
প্রথাগত মাদকের পাশাপাশি বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের কাছে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যথানাশক ঔষধের অপব্যবহার। বিশেষ করে 'ট্যাপেন্টাডল' ট্যাবলেট এখন ইয়াবার বিকল্প হিসেবে সস্তা ও সহজলভ্য নেশায় পরিণত হয়েছে। এটি মূলত একটি শক্তিশালী পেইনকিলার, যা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে ‘খ’ শ্রেণির মাদক হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিন্তু আইন ফাঁকি দিয়ে ফার্মেসিগুলোতে এর অবাধ বিক্রি প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শুধু ট্যাপেন্টাডল নয়, বিভিন্ন ধরনের কাফ সিরাপ, ঘুমের ঔষধ এবং ইদানীং 'প্রিগাবালিন' (Pregabalin) জাতীয় ওষুধের উচ্চমাত্রার ব্যবহার তরুণদের স্নায়ুতন্ত্র অকেজো করে দিচ্ছে। এই তথাকথিত 'ফার্মাসিউটিক্যাল ড্রাগ' বা প্রেসক্রিপশন ড্রাগগুলো হাতের নাগালে থাকায় কিশোররা খুব সহজেই নেশার জগতে প্রবেশ করছে, যা অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের অগোচরেই থেকে যাচ্ছে।
মাদকের এই নীল দংশন কেবল কৌতূহল থেকে আসছে না, এর পেছনে রয়েছে গভীর আর্থ-সামাজিক কারণ:
১. সিন্থেটিক ড্রাগের আগ্রাসন: গত কয়েক বছরে ইয়াবার চেয়েও শক্তিশালী 'আইস' বা 'এলএসডি'র মতো মাদক তরুণদের মগজ ধোলাই করছে।
২. মানসিক স্বাস্থ্যের অবহেলা: বিষণ্ণতা, একাকিত্ব এবং প্রতিযোগিতামূলক জীবনের চাপ কাটাতে তরুণরা মাদকের ভ্রান্ত আশ্রয়ে ছুটছে।
৩. প্রযুক্তির অপব্যবহার: ডার্ক ওয়েব এবং এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে এখন ঘরে বসেই মাদকের হোম ডেলিভারি পাওয়া যাচ্ছে, যা একে ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।
মাদক মূলত তিনটি স্তরে একটি জাতিকে পঙ্গু করে দেয়:
১. শারীরিক ও মানসিক ধস: মাদকাসক্ত ব্যক্তি দ্রুত লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, কিডনি বিকল হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদী সিজোফ্রেনিয়ার মতো জটিলতায় ভোগে।
২. পারিবারিক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: একজন মাদকাসক্তের জন্য পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। চুরি, ছিনতাই এবং পারিবারিক সহিংসতার মূলে থাকে এই নেশার টাকা জোগাড়ের তাড়না।
৩. মেধা পাচার ও নেতৃত্ব শূন্যতা: যখন একটি দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বড় অংশ নেশাগ্রস্ত থাকে, তখন সেই দেশ উদ্ভাবনী শক্তি ও নেতৃত্ব হারায়।
প্রতিরোধের প্রথম দুর্গ: পারিবারিক দায়বদ্ধতা
মাদকের এই বিষাক্ত ছোবল থেকে সন্তানকে বাঁচাতে রাষ্ট্রীয় আইনের চেয়েও বেশি কার্যকর হলো পারিবারিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, একজন সন্তান যখন মাদকাসক্ত হয়, তখন তার শুরুটা কোনো গলি বা আড্ডায় হলেও তার কারণগুলো অনেক সময় লুকিয়ে থাকে পরিবারের চার দেয়ালের ভেতরেই।
শাসনের চেয়ে বন্ধুত্বের গুরুত্ব বেশি:
আমাদের সমাজে বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের দূরত্ব অনেক ক্ষেত্রে মাদকাসক্তির পথ প্রশস্ত করে। সন্তান যখন তার মনের অস্থিরতা, ব্যর্থতা বা বিষণ্ণতা পরিবারের কাছে প্রকাশ করতে পারে না, তখনই সে বাইরের ভুল মানুষের কাছে সান্ত্বনা খোঁজে। পারিবারিক দায়বদ্ধতা মানে কেবল কঠিন শাসন নয়, বরং সন্তানের সাথে এমন এক আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা, যাতে যেকোনো সংকটে সে সবার আগে পরিবারের কাছে ফিরে আসে। নৈতিকতার প্রাথমিক বিদ্যালয় হলো পরিবার। শৈশব থেকেই যদি সন্তানকে আদর্শ, মূল্যবোধ এবং মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতন করা যায়, তবে বাইরের কোনো প্রলোভন তাকে সহজে টলাতে পারে না। 'সহজেই সব পাওয়া'র মানসিকতা পরিহার করে পরিশ্রম ও সততার শিক্ষা তাই পরিবার থেকেই আসা জরুরি।
সজাগ দৃষ্টি ও গুণগত সময়:
পরিবারের বড়দের উচিত সন্তানের বন্ধুদের সার্কেল সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখা। সে কার সাথে মিশছে, কোথায় অবসর সময় কাটাচ্ছে এবং ইন্টারনেটে তার বিচরণ কোথায়—এই বিষয়গুলোতে গোয়েন্দাগিরি নয়, বরং সচেতন তদারকি থাকা প্রয়োজন। সন্তান হঠাৎ করে চুপচাপ হয়ে যাওয়া, মেজাজ হারানো বা খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা না করে দ্রুত সহমর্মিতার সাথে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে হবে। যান্ত্রিক জীবনে আমরা একই ছাদের নিচে থেকেও সবাই যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বাস করছি।
অথচ পারিবারিক বন্ধন মজবুত করার একটি বড় উপায় হলো নিয়মিত অন্তত একবেলা সবাই মিলে খাবার খাওয়া এবং গল্প করা। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পরিবারে নিয়মিত গুণগত সময় কাটানোর রেওয়াজ আছে, সেসব পরিবারের সন্তানদের বিপথে যাওয়ার হার নগণ্য। তবে কোনো সন্তান যদি ইতোমধ্যে আসক্ত হয়ে পড়ে, তবে পরিবারের লুকোছাপা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ বা রিহ্যাব সেন্টারের সহায়তা নেওয়া উচিত।
বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন সান্নিধ্য:
অনেক সচ্ছল পরিবারে দেখা যায়, বাবা-মা কর্মব্যস্ততার গ্লানি মুছতে বা সন্তানকে ভুলিয়ে রাখতে অঢেল টাকা বা দামি গ্যাজেট হাতে তুলে দেন। কিন্তু সন্তান আসলে কাগুজে টাকা নয়, বাবা-মায়ের সান্নিধ্য চায়। অঢেল হাতখরচ অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়ে মাদক কেনার সহজ উৎস হয়ে দাঁড়ায়। তাই সন্তানকে বস্তুবাদী বিলাসিতায় ডুবিয়ে না রেখে আপনার সময় দিন। তাকে বোঝান যে সে আপনার কাছে কতটা মূল্যবান। মাদকের চাহিদাকে শূন্যে নামিয়ে আনার এই ক্ষমতা কেবল একটি সচেতন পরিবারেরই রয়েছে।
মাদকের এই সহজলভ্যতা রোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ভূমিকা এখন অনস্বীকার্য। বিশেষ করে পাড়া-মহল্লার ফার্মেসিগুলোতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ট্যাপেন্টাডল বা প্রিগাবালিনের মতো ঔষধ বিক্রি বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। ড্রাগ লাইসেন্স বাতিলসহ নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে ফার্মেসিগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। জীবন রক্ষাকারী ঔষধ যেন জীবননাশের হাতিয়ার না হয়, তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
মাদক নামক এই নীরব ঘাতক কেবল একটি জীবন কেড়ে নেয় না, এটি একটি সাজানো সংসারকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দেয়। রাষ্ট্রের আইন মাদক সরবরাহ বন্ধ করতে পারে, কিন্তু মাদকের চাহিদাকে শূন্যে নামিয়ে আনার ক্ষমতা রাখে কেবল পরিবার।
আসুন, আমরা সচেতন হই। আমাদের সন্তানরা যেন কেবল জিপিএ-৫ বা ভালো ক্যারিয়ারের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে একাকিত্বের চোরাবালিতে হারিয়ে না যায়। প্রজন্মকে অন্ধকার থেকে বাঁচাতে হলে পরিবারকেই দীপশিখা হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখবেন, আপনার সন্তানই আপনার শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ; তাকে সময় দিন, তাকে রক্ষা করুন।
লেখক: সংগঠক ও গণমাধ্যমকর্মী
৯ ঘন্টা ৫ মিনিট আগে
৩ দিন ১ ঘন্টা ৪৫ মিনিট আগে
৫ দিন ৩ ঘন্টা ২২ মিনিট আগে
৫ দিন ২০ ঘন্টা ৩১ মিনিট আগে
১০ দিন ২১ ঘন্টা ৩ মিনিট আগে
১২ দিন ১৫ ঘন্টা ২৪ মিনিট আগে
১৫ দিন ১০ ঘন্টা ৪৩ মিনিট আগে
২৫ দিন ১৬ ঘন্টা ১৬ মিনিট আগে