আবদুর রব সজল ধর্মপাশা সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃসুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের নির্মল জলরাশি, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর আনন্দভ্রমণের স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল ছোট্ট সৌম্যতা সরকার নিঝুমের। কিন্তু আনন্দভ্রমণই হয়ে উঠল তার জীবনের শেষ যাত্রা। মুহূর্তের এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিভে গেল মাত্র আট বছরের এক নিষ্পাপ প্রাণ। তার অকাল প্রস্থানে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবার, সহপাঠী, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মাঝে।
শুক্রবার (৫ জুন) বিকেল ৩টার দিকে তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকবাহী ‘ভ্রমণশৈলী’ নামের একটি হাউসবোটে দুর্ঘটনায় মারা যায় সৌম্যতা সরকার নিঝুম (৮)। সে ধর্মপাশা উপজেলার কামলাবাজ গ্রামের বাসিন্দা স্বপন চন্দ্র সরকারের মেয়ে এবং সুনামগঞ্জ শহর বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে নতুন চালু হওয়া একটি হাউসবোটের উদ্বোধনী ভ্রমণে টাঙ্গুয়ার হাওরে গিয়েছিল সৌম্যতা। হাওরে গোসল শেষে নিলাদ্রী লেকের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার সময় হাউসবোটের পেছনের অংশ থেকে সামনের দিকে যাওয়ার পথে অসাবধানতাবশত পা পিছলে চলন্ত ইঞ্জিনের মধ্যে পড়ে যায় সে। সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিন বন্ধ করা হলেও গুরুতর আঘাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের ঢেউ বয়ে যায়। শিক্ষক, সহপাঠী ও পরিচিতজনেরা স্মরণ করেন প্রাণবন্ত, মেধাবী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রতিভাবান এই শিশুকে।
সৃজন বিদ্যাপীঠের শিক্ষিকা শতাব্দী দাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “আমাদের স্টুডেন্ট সৌম্যতা আর নেই। মেয়েটা এত মিষ্টি, শান্ত আর ভদ্র ছিল যে সবার নজরে পড়ত। ক্লাসে সবসময় হাসিমুখে বন্ধুদের সঙ্গে মিশে থাকত। নাচে তার ছিল অসাধারণ প্রতিভা। আজও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, সে আর আমাদের মাঝে নেই।”
তিনি আরও জানান, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে সৌম্যতা ছিল সবার প্রিয় মুখ। এক অনুষ্ঠানে পুতুলের মতো সেজে তার নাচে মুগ্ধ হয়েছিলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। নাচের প্রতি তার ভালোবাসা এতটাই ছিল যে একদিন ক্লাসে নিজেই তার প্রিয় গান ‘সোহাগ চাঁদ’-এর কথা বলেছিল।
শিক্ষিকার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে আরেকটি আবেগঘন মুহূর্ত। বছরের শেষ ক্লাসে সৌম্যতা বলেছিল, “ম্যাডাম, আগামী বছর এই স্কুলে আমি আর থাকব না, অন্য স্কুলে চলে যাব।” তখন কেউ কল্পনাও করেননি, সে শুধু স্কুল নয়, পৃথিবীর মায়াও ছেড়ে চলে যাবে চিরদিনের জন্য।
মল্লিকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সম্পা তালুকদারও শোক প্রকাশ করে লিখেছেন, “ফুটফুটে এই শিশুটির মুখটা দেখে বুকটা ভার হয়ে আসে। হয়তো ছুটির আনন্দ শেষে রবিবার স্কুলে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল সে। কিন্তু আর কোনোদিন স্কুলে যাওয়া হবে না তার। জেলা শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে আর শোনা যাবে না তার নূপুরের রিনিঝিনি শব্দ। সহপাঠীরা তাকে খুঁজবে, অথচ সে এখন শুধুই স্মৃতি।”
এদিকে তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শিশুটির সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় এবং বাবার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
একটি আনন্দভ্রমণ মুহূর্তেই রূপ নিল অপূরণীয় শোকে। ছোট্ট সৌম্যতা সরকার নিঝুমের অসময়ে চলে যাওয়া শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো এলাকার মানুষের হৃদয়ে গভীর বেদনার ছাপ রেখে গেছে। তার হাসিমাখা মুখ, প্রাণবন্ত উপস্থিতি এবং স্বপ্নভরা শৈশব এখন শুধুই স্মৃতি।
৫৮ মিনিট আগে
৫৯ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ২৪ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ৫৬ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ৫৮ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ৫৯ মিনিট আগে
৪ ঘন্টা ৪৪ মিনিট আগে
৫ ঘন্টা ১৯ মিনিট আগে