আজ বিশ্ব নারী দিবস। নারী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন ৮ মার্চ। নারীর অধিকার এবং মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯১৪ সাল থেকে ৮ মার্চ "আন্তর্জাতিক নারী দিবস" হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। প্রতিবছর বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যথাযথ মর্যাদার সহিত এই দিনটিকে পালন করা হয়ে থাকে। পশ্চাৎপদ নারী সমাজকে এগিয়ে নিতে এবং নারী-পুরুষের ভেদাভেদ দূর করতে সমাজ সংস্কারক কিংবা সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সময় নানা ধরনের উদ্যোগ নিতে দেখা যায়। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নগন্য। আধুনিক এ যুগে পা রেখেও নারীর প্রতি গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হয় নি। বরং নারীর প্রতি সহিংসতা যেন বেড়েই চলেছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউই রক্ষা পাচ্ছে না জন্তুরূপী পুরুষের নির্যাতন থেকে। পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, গুম, যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় স্ত্রীর গায়ে আগুন দেয়ার মতো লোহমর্ষক খবর। আজও আমাদের দেশের নারীরা রাতের বেলা একা চলতে ভয় পায়। দেশের প্রচলিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুশাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ নারী সমাজ। ফলে শিক্ষা, রাজনীতি, কর্মসংস্থান,সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণসহ নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নারীরা। অথচ পুরুষের চেয়ে কোনো অংশেই অযোগ্য নয় নারীরা। সুযোগ পেলে তারাও বিশ্ব জয় করে চোখে তাক লাগিয়ে দিতে পারে গোটা মানবজাতির। নারী শুধু পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী নয়। দেশমাতৃকাকে রক্ষায় কখনো সে বীরাঙ্গনাবেশে পুরুষের সাথে যুদ্ধ করে, আবার কখনো সে রাজনীতিতে পুরুষের সহযাত্রী হিসেবে কাজ করে, কখনোবা সে সমাজ সংস্কারক হিসেবে আবির্ভূত হয়।
বিশ্ব নারী দিবস উপলক্ষ্যে নারীরা কেমন পৃথিবী চান, চলতি পথে তাদের কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, দেশের প্রচলিত সমাজ বাস্তবতায় নারী-পুরুষের সমতা আদৌ এসেছে কিনা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া নারী শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে দৈনিক দেশচিত্র। শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেছেন
• আয়শা সিদ্দিকা।
◾ মেহেরাজ জেবিন ইফতি
শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।
• অনেকেরই ধারণা, নারী মানেই সব পারতে হবে, মেনে নিয়ে, মানিয়ে নিয়ে চলতে হবে। কেন নারী বলেই সব পারতে হবে! কিসের এত দায়! একজন নারী এবং তারচেয়েও বড় কথা একজন মানুষ হিসেবে আমি চাই অতিরঞ্জিত করে নয়, সুস্থ স্বাভাবিক চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমেই নারীদের আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো ভাবতে হবে। নারী বলে আমাদের খুব স্পেশাল ফেভার করারও দরকার নেই। বরং স্বাভাবিক ভাবে মানুষের মতো করে চলতে দিলেই আমি বেশি খুশি হবো। নারীর সম্মান ! সেটা তো ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক শিক্ষা। সেটা যদি কেউ পারে করুক না পারে তো অসম্মান না করলেই হবে। তবে হ্যা, বলা বাহুল্য কিছু ক্ষেত্রে নারীর শত্রু নারীই হয়ে থাকেন। যেখানে আপনার চারপাশের পুরুষরা আপনাকে খোলা আকাশে ডানা মেলে উড়তে ডানা তৈরি করে দেবে, সেখানে দেখা যায় ডানা ছেঁটে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা করে প্রতিবেশী, তথাকথিত আত্মীয় বা আন্টি রূপী কিছু নারীরা। এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মই হওয়ার বিপরীতে তারা কাটা রূপে ফুটে ওঠে। শুধু অশিক্ষিত বা অর্ধ শিক্ষিত নয়, বরং স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত, বিসিএস ক্যাডার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরীরত কিছু কুশিক্ষিত নারীরাও বেশ দায়িত্ব নিয়ে এসব কাজ করে আসছেন প্রতিনিয়ত। এমনকি অনেকে ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনার ক্ষেত্রেও ধর্ষকের চেয়ে ধর্ষিতাদের বেশি দোষ দিতে ভুলেন না।
সবাই বলে সমঅধিকার। কিন্তু সমতা কোথায়! সমতা থাকলে নারী পুরুষ উভয়েরই সারাদিন বাইরে খাটাখাটুনি করে ঘরে আসার পর সংসার শুধু নারীকেই সামলাতে হতো না। কিংবা গৃহী নারীদের সারাদিন সংসারের জন্য খেটে যাওয়া নারীকে উঠতে বসতে, আর্থিক অসচ্ছলতার কিংবা সো কল্ড কিছু না করার জন্য বিভিন্নভাবে কথা শুনতে হতো না। চারপাশে একটু তাকালেই সমঅধিকারের এমন উদাহরণ আমরা কম পাবো না।
তবে হ্যাঁ, আমার মতে সমান অধিকারের চেয়েও নারীর সম্মানটা বেশি জরুরি। সম্মান থাকলে নারীর জন্য সহমর্মিতা বা দরদ এমনিতেই এসে যাবে। একটি শিশু বেড়ে ওঠার সাথে সাথে পারিবারিক ভাবেই নারী পুরুষ আলাদা করে না বুঝিয়ে তাদের মানুষ রূপে গড়ে তোলা হোক। শুধু নারী দিবসের জন্য নয় নারীর প্রতি সবার সম্মান, শ্রদ্ধা ভালোবাসা বিরাজ করুক বছর জুড়ে।
◾ আমিনা ইয়াসমিন
শিক্ষার্থী,বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
• নারী... শব্দটি শুনলেই আমরা বলি মা, বোন, স্ত্রী, মেয়ে। সমাজ কিছুটা বেশি সময় নিলেও নারীর সমার্থক শব্দ হিসেবে এর সবগুলোকেই গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে। কিন্তু এখনও নারী মানে যে সহকর্মী বা বন্ধু হতে পারে তা মেনে নিতে পারছে না।
" নারী পুরুষের সমতা" এই ভাবনার সাথে কম বেশি আমরা সবাই পরিচিত। কেউ এটাকে ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করেন আবার কেউবা নেতিবাচকভাবে বিশ্লেষন করেন। এই সমতা আনয়নের জন্য বিশ্বের প্রায় সব দেশই তাদের শিক্ষাক্ষেত্রে, অর্থনৈতিকক্ষেত্রে, রাজনৈতিকক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিয়েছে, বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। যার প্রতিফলন আমরা সমাজের দিকে তাকালেই দেখছি। এটি যেমন আশার আলো দেখাচ্ছে তেমনি নারীর প্রতি বৈষম্যের নতুন নতুন দাড়ও উন্মোচিত হচ্ছে। যেমন, একজন ছেলে শিক্ষার্থীর জন্য সাধারনত সকালে উঠে প্রথম কাজ ফ্রেশ হয়ে পড়তে বসা তারপর স্কুল বা কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া। ফিরে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার পড়াশোনা করা। এই রুটিনের কিছুটা হেরফের হলেও সাধারণত এর আশেপাশে ছেলেদের প্রতিদিনের রুটিন হয়ে থাকে।কিন্তু একজন মেয়ে শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে সকালে উঠে নাস্তা বানানো, তারপর থালা বাসন ধুয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়।ফিরে এসে আবার দুপুরের খাবার তৈরি করতে হয় অথবা তৈরিতে সাহায্য করতে হয়, কাপড় কাচতে হয়, ঘর পরিষ্কার করতে হয়। এইসব নিত্য নৈমিত্তিক কাজের ফাঁকে তাকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়। তার উপর ইভটিজিং এর মেন্টাল প্রেশার তো আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর প্রসারের কারনে এই সমস্যা আরও বহুবিধ রূপ নিয়েছে। এতকিছু সামলানোর পর যখন একজন মেয়ে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে তখন শুরু হয় নতুন পরিক্ষা। আর এ পরীক্ষার সম্মানিত পরীক্ষক হিসেবে থাকেন তার নিজ সহকর্মীরা। প্রতিদিন প্রতিটা কাজে একজন নারীকে তার যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়, বলা যায় বাধ্য করা হয়। যখন কোনো পুরুষ সহকর্মী কাজে আসে না তখন বলা হয় সে অসুস্থ কিন্তু নারী সহকর্মী না আসলে বলা হয় অসুস্থতার বাহানা। যখন কোনো নারী কোনো প্রজেক্টের কিংবা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে কাজ করে তখন তার জুনিয়রদের কাছেও তাকে নিজেকে প্রমান করতে হয় পদে পদে। একজন পুরুষ একবার যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন আর নারীর যোগ্যতার পরীক্ষা চলতেই থাকে। সবসময় মানসিকভাবে স্ট্রেসে থাকতে হয় নিজের অর্জন নিয়ে।আর সফলভাবে কাজ শেষ করতে পারলে তখন আবার নতুন নতুন অহেতুক ব্যাখ্যা দাড় করানো হয় কিভাবে সে সফল হলো।
বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়ন শুরু হয়েছে, কাজে সমান সুযোগ চাওয়া হচ্ছে, সমাজ বদলাচ্ছে। কিন্তু আমাদের মানসিকতা কবে বদলাবে? কবে মেয়েদের কাজের সাথে সাথে নিজের পোশাক, নিজের যোগ্যতা নিয়ে বাড়তি চিন্তা কমবে? কবে মানসিক স্ট্রেসের দিক থেকে সমতা আসবে?
এই কবের অবসান সেদিনই হবে যেদিন নারীর প্রতি আমাদের মানসিকতা বদলাবে, যেদিন নারী পুরুষ উভয়কে সমাজের অত্যাবশ্যকীয় অংশ হিসেবে মানা হবে যেদিন আমরা মন থেকে বিশ্বাস করবো নজরুলের সেই অমর বানী-
" আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!
বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর ”
◾অনামিকা আক্তার
শিক্ষার্থী,বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।
•বিশ্ব আজ আধুনিক। বাংলাদেশেও লেগেছে আধুনিকতার ছোয়া। আর যেকোনো দেশকে আধুনিক, উন্নত বিশ্বের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নারীদের অবদান এর শেষ নেই।বলা হয়ে থাকে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের সমান অধিকার রয়েছে।
নারীরা কি আদৌ পুরুষদের মতো সমান অধিকার পেয়েছে? বাংলাদেশের গ্রামঞ্চলের পরিবারগুলো আজও নারীদের বোঝা মনে করে।পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করলে যতটা খুশি, তার থেকে যখন মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণ করে তখন তাদের কপালে ভাজ পড়ে যায়। আজও নারীরা পরিবারের কাছে অবহেলা পাত্রী। প্রচলিত আছে যে, ছেলেরা হচ্ছে বংশের বাতি,তারা বাবা মা কে দেখবে। কিন্তু মেয়েরা কী বাবা মায়ের দায়িত্ব নিচ্ছে না?
নারীরা এখনও স্বাধীনতার দিক দিয়ে পিছিয়ে। সবার আগে পরিবার নারীদের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন করে।তাদের ইচ্ছা,মনের ভাব,কথা,সিদ্ধান্ত জ্ঞাপন করতে দেয় না।
শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীদের সমতা নেই বললেই চলে। মা-বাবারা ছেলেদেরকে পড়াশোনার জন্য দূরেও পাঠাবে কিন্তু মেয়েদের যদি পড়াশোনা করানোও হয় তাও দেশের সস্তা কলেজে।
রাস্তাঘাটে চলাফেরা করার সময় নারীদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়।যেমন ধর্ষন,ইভটিজিং।দেশের কর্মসংস্থানে নেই সমতার বালাই। বিশ্ব আধুনিক হলেও নারীদের জীবনে নেই আধুনিক সমতা।
সর্বশেষে শুধু একটা কথাই বলতে চাই নারী-পুরুষের মধ্যে সকল বৈষম্য দূর হয়ে একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল, বৈষম্যবিহীন পৃথিবী গড়ে উঠুক। সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের একত্র অংশগ্রহণে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলুক বিশ্ব।
১২ দিন ১৩ ঘন্টা ৭ মিনিট আগে
১১৯ দিন ৯ ঘন্টা ২৮ মিনিট আগে
১৫৫ দিন ১৯ ঘন্টা ৪৬ মিনিট আগে
১৫৬ দিন ১২ ঘন্টা ৫ মিনিট আগে
১৯৩ দিন ১৫ ঘন্টা ৪৭ মিনিট আগে
২২৭ দিন ১৮ ঘন্টা ১৯ মিনিট আগে
২৪৬ দিন ১৯ ঘন্টা ৮ মিনিট আগে
২৬৩ দিন ১৪ ঘন্টা ৫৭ মিনিট আগে