সুন্দরবন খ্যাত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর এই ম্যানগ্রোভ বনের আয়তন ১৩ হাজার ৬৪৩ একর। এখানে ২০১০-১১ ও ১১-১২ অর্থবছরে দুই কোটি ৬৪ লাখ টাকা খরচ করে নির্মাণ করা হয় টেংরাগিরি ইকোপার্ক। ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন এই ইকোপার্কটি। এই ইকোপার্কে দেখা যাবে মায়াবী হরিণ, কাঠবিড়ালি, কুমির, বানরসহ নানা ধরনের বন্যপ্রাণী ও সুন্দরবনের হাজারো রকমের গাছ। এসব সৌন্দর্য উপভোগ করতে হাজার হাজার পর্যটক আসতো এখানে। কিন্তু পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে টুরিস্ট পুলিশ না থাকায় চুরি ছিনতাইসহ নানান অপরাধ একের পর এক সংগঠিত হয় এখানে। এমনকি ২০২০ ও ২০২১ সালে দুটি গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে এখানে। আর ইভটিজিং এখানকার নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।
ট্যাংরা গিরি ইকো পার্কে ঢাকার গুলশান থেকে ঘুরতে আসা উম্মে সিনথিয়া মৌসহ তার সফল সঙ্গীরা বলেন,২০১৮ সালে একবার কুয়াকাটা আসেন। সেখানে এসে জানতে পারি বরগুনার তালতলীর টেংরাগিরি ইকোপার্কের কথা। তখনই আমরা এখানে এসেছিলাম। কুয়াকাটায় তো শুধু সমুদ্র সৈকত, কিন্তু এই পার্কে এসে তখন আমি মুগ্ধ হয়ে ছিলাম। কি নেই এখানে? হাজার প্রজাতির গাছের বন, বনে রয়েছে সুন্দরবনের মতোই নানান সব প্রাণী। গভীণ অরণ্যে হাঁটতে থাকলে দেখা মিলবে অপরূপ সমুদ্র সৈকত। সেই মুগ্ধতা থেকেই আমি আবার এসেছি। কিন্তু এখানে স্থানীয় বখাটেদের উৎপাতে আমরা অস্থির।
তারা আরও বলেন, এখানে আমাদের কোন নিরাপত্তা নেই। বোনটি সংরক্ষিত থাকায় এখানে বন বিভাগের নজরদারি থাকার কথা। কিন্তু তাদের দেখাও পাইনি। এই পার্কে পর্যটকদের কোন নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। বোকাটেরা তাদের মতন করে ইভটিজিং করে যাচ্ছে আর পর্যটকরা সহ্য করে যাচ্ছে।
এক পর্যটক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্ত্রী ও দুই কন্যাকে নিয়ে ঘুরতে এসেছেন তিনি। কিন্তু কিছু বকাটেরা দূর দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের বিরক্ত করছে। দেখলে মনে হয় এরা বেশিরভাগ মাদকাসক্ত এবং জেলে পেশায় জড়িত। বখাটেদের সাথে তাল মিলাতে দেখলাম কিছু বয়স্ক মানুষদেরও। এখানে যেসব পর্যটকরা একবার আসেন, তারা এখানকার মনমুগ্ধকর সৌন্দর্য উপভোগ করেন আতংক নিয়ে।টেংরাগিরি ও শুভ সন্ধ্যা ঘুরতে আসা অসংখ্য পর্যটক এই একই অভিযোগ করেন।
তালতলীর শুভসন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা, জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, সৈকতের পাশে ঝাউবাগানটি অত্যন্ত দৃষ্টি নন্দন। একপাশে সমুদ্র আরেক পাশে দৃষ্টিনন্দন ঝাউ বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে অনেক পর্যটক এখানে আসেন। এখানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যদি নারীরা না আসেন তাহলেই ঘটে বিপত্তি। স্থানীয় পকেটের আটকে মোবাইল স্বর্ণালঙ্কার সহ টাকা পয়সা রেখে দেন। কিন্তু এর প্রতিবাদ করার কোনো লোক নেই এখানে। নেই টুরিস্ট পুলিশ, নেই কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও।
ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করা সংগঠন বরগুনা জেলা ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি আরিফ রহমান বলেন, বারবার গণধর্ষণও ইভটিজিং এর মত ঘটনা ঘটায় তালতলীর টেংরাগিরি ইকোপার্ক ও শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে পর্যটকরা। এখানে ট্যুরিস্ট পুলিশ ক্যাম্প না করলে পর্যটক শূন্য হয়ে পড়বে এসব পর্যটন কেন্দ্র। দ্রুত এই পর্যটক স্থানগুলোতে টুরিস্ট পুলিশ দেওয়া হোক।
তালতলী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বলেন, এই উপজেলায় সুন্দর সুন্দর পর্যটক কেন্দ্র যা আছে যা অন্য সবার থেকে ভালো। তবে আমাদের নিরাপত্তার অভাবে দিন দিন পর্যটক শূন্য হচ্ছে এবং পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। যার কারণে এই পর্যটক স্থানগুলো বিলুপ্ত হওয়ার পথে। আমাদের দাবি দ্রুত টুরিস্ট পুলিশ এখানে দিয়ে পর্যটকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হোক।
বরগুনা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন ফসল বলেন, আমার বাড়ি তালতলী উপজেলায়। তালতলীর টেংরাগিরি ইকোপার্ক ও শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকতে অসংখ্য পর্যটক আসত। এসব এলাকার অনেক নিম্ন আয়ের মানুষ পর্যটন কেন্দ্রকে ঘিরে বিভিন্ন রকমের দোকান সহ ব্যবসা শুরু করেছিল। অনেক ব্যবসায়ীরা জমি কিনে আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থাও করতে চেয়েছিল। কিন্তু কিছু মাদকাসক্ত বখাটেদের জন্য যত বছর যাচ্ছে তত পর্যটকও কমছে। গত দুই বছর ধরে প্রায় পর্যটক শূন্য হয়ে পড়েছে এ পর্যটন কেন্দ্র দুটি। এখানে টুরিস্ট পুলিশ ক্যাম্প হলে একদিকে যেমন পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, ঠিক তেমনি অসংখ্য নিম্ন এর মানুষের ভাগ্য বদলাবে।
তালতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী সাখাওয়াত হোসেন তপু বলেন পুলিশ সুপার নির্দেশে আমাদের থানার একটি টিম সার্বক্ষণিক টুরিস্ট এলাকায় টহল দিচ্ছে। যতদিন টুরিস্ট পুলিশ না আসে ততদিন পর্যটকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
টুরিস্ট পুলিশের বিষয় বরগুনার পুলিশ সুপার মো. আব্দুস ছালাম বলেন জেলা প্রশাসনের আইন-শৃঙ্খলার মিটিংয়ে রেজুলেশন পাস করে লিখিতভাবে ঊর্ধ্বজন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। ক্যাম্প স্থাপনের আগ পর্যন্ত তালতলী থানা পুলিশ দিয়ে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।