প্রকাশের সময়: 12-09-2026 07:52:33 pm
ওষুধ বা কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই কেবল চৌম্বকীয় তরঙ্গের সাহায্যে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে উদ্দীপনা জুগিয়ে বিষণ্নতার (ডিপ্রেশন) মতো মানসিক সমস্যার চিকিৎসা সম্ভব। এই ধারণাকে ভিত্তি করে কম্পিউটেশনাল ব্রেন স্টিমুলেশন নিয়ে গবেষণা করে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে ‘আইইইই বেস্ট পেপার অ্যাওয়ার্ড’ (IEEE Best Paper Award) জিতে নিয়েছেন জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবিপ্রবি) শিক্ষার্থী মোহাম্মদ তানভীর।
সম্প্রতি ঢাকার আইইউবিএটি (IUBAT) বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘ফিফথ আইইইই বেসিথকন ২০২৬’ (5th IEEE BECITHCON 2026)-এ এই সম্মাননা অর্জন করেন তিনি। কনফারেন্সটির পূর্ণাঙ্গ নাম ‘আইইইই ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি ফর হেলথ’। স্নাতক শেষ করার আগেই এমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করে বিশ্ববিদ্যালয় ও নিজের বিভাগের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী।
তানভীরের গবেষণার মূল বিষয় ছিল ‘ট্রান্সক্রেনিয়াল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশন’ বা টিএমএস (TMS)-এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার অপটিমাইজেশন। বিশেষ করে মস্তিষ্কের ‘লেফট ডরসোল্যাটারাল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ বা F3 টার্গেটে চৌম্বকীয় ক্ষেত্র প্রয়োগ করে কীভাবে নিষ্ক্রিয় নিউরনগুলোকে পুনরায় কর্মক্ষম করা যায়, তা নিয়েই কাজ করেছেন তিনি।
পুরো গবেষণাটি তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম ধাপে টিএমএস-এর জন্য সেরা কয়েল নির্বাচন, দ্বিতীয় ধাপে নির্দিষ্ট স্থানে কয়েল বসিয়ে সেরা কোণ (angle) খুঁজে বের করা এবং শেষ ধাপে কয়েলের দূরত্বের সঙ্গে ইলেকট্রিক ফিল্ডের শক্তির ভারসাম্য বিশ্লেষণ করা হয়। ওপেন-সোর্স সিমুলেশন সফটওয়্যার 'SimNIBS' ব্যবহার করে সম্পন্ন করা এই গবেষণাটি বাংলাদেশে একেবারেই নতুন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
গবেষণার পথটি তানভীরের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। ছোটবেলা থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রতি আগ্রহ থাকলেও গণিতে কিছুটা দুর্বলতা ছিল তাঁর। নিজেকে বিভাগের একজন ‘গড়পড়তা শিক্ষার্থী’ হিসেবেই মানেন তিনি। তবে তাঁর এই সফলতার পেছনে মূল কারিগর ছিলেন তাঁর একাডেমিক সুপারভাইজার ও ইইই বিভাগের প্রভাষক মো. আমিমুল ইহসান।
সঠিক রিসোর্সের অভাব এবং ইন্টারনেট বা ইউটিউবে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় পদে পদে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে তানভীরকে। তবে নিয়মিত লিটারেচার স্টাডি এবং সুপারভাইজার আমিমুল ইহসানের নিবিড় তত্ত্বাবধানে তিনি এই বাধা পেরিয়ে যান।
গত ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ওই আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৭০০-এর বেশি গবেষণাপত্র জমা পড়েছিল। এর মধ্য থেকে উপস্থাপনের জন্য নির্বাচিত হয় প্রায় ১৭০টি। ৪ সেপ্টেম্বর সকালে তানভীর তাঁর গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করেন এবং প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের টেকনিক্যাল প্রশ্নের দারুণভাবে উত্তর দেন।
৫ সেপ্টেম্বর ছিল পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। সেখানে দেশের স্বনামধন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকদের উপস্থিতিতে নিজের পুরস্কার পাওয়ার কোনো আশাই করেননি কেবল আন্ডারগ্রাজুয়েট শেষ করা তানভীর। তাই অনুষ্ঠানে না গিয়ে বাসাতেই ছিলেন তিনি। সন্ধ্যায় হঠাৎ ফোনে জানতে পারেন, তাঁর পেপারটি ‘বেস্ট পেপার অ্যাওয়ার্ড’ এবং ১০ হাজার টাকার প্রাইজমানি জিতে নিয়েছে। শুরুতে বিশ্বাস না হলেও পরে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হন তিনি।
শিক্ষার্থীর এই অর্জনে অত্যন্ত আনন্দিত তাঁর একাডেমিক সুপারভাইজার ও ইইই বিভাগের প্রভাষক মো. আমিমুল ইহসান। এর আগে ২০২৪ সালে শিক্ষক হিসেবে তিনি নিজেও এই অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটি প্রথম এবং নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গর্বের বিষয়। তানভীরের গবেষণার ধারণাটি খুবই চমৎকার ছিল।”
শিক্ষার্থীদের প্রতি বার্তা দিয়ে তিনি আরও বলেন, “ভালো গবেষক হওয়ার জন্য একটি রিসার্চ মাইন্ডসেট তৈরি করতে হবে। শুধু ভালো ফলাফল করার চিন্তা করলেই হবে না; আত্মবিশ্বাসী হতে হবে এবং গবেষণায় ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। তানভীর আমাদের সব শিক্ষার্থীর জন্য একটি অনুপ্রেরণা। কোনো একটি বা দুটি সেমিস্টার খারাপ গেলেই কারও ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায় না।”
যেহেতু এই গবেষণাটি পুরোপুরি সিমুলেশন-ভিত্তিক, তাই বাংলাদেশে এখনই এর ক্লিনিক্যাল প্রয়োগের সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে উন্নত ল্যাব সুবিধা সংবলিত দেশের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটেশনাল ব্রেন স্টিমুলেশন বা এআই-ভিত্তিক হেলথকেয়ার প্রযুক্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা চালিয়ে যেতে চান তানভীর।
৬ ঘন্টা ৪৭ মিনিট আগে
৮ ঘন্টা ৩৫ মিনিট আগে
৯ ঘন্টা ২০ মিনিট আগে
১ দিন ২ ঘন্টা ৫৭ মিনিট আগে
১ দিন ৬ ঘন্টা ৪৫ মিনিট আগে
২ দিন ২ ঘন্টা ৩১ মিনিট আগে
২ দিন ৬ ঘন্টা ২৪ মিনিট আগে