ড. মো: আব্দুল কুদ্দুস সিকদার :
আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার বিরুদ্ধে নানাবিধ অবরোধ আরোপ করে নিজেরাই এখন মহাবিপদে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট বেড়ে যাওয়ায় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ নানা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বিভিন্ন দেশে। বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলোতে এসব সংকট ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ইতিমধ্যেই জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ ও লাকড়ি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে পোলান্ড সরকার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গ্যাসের ব্যবহার ১৫% কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রাশিয়া গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ায় বিপদে পড়েছে ডেনমার্ক সরকার। দেশটির অধিকাংশ মানুষই ইলেকট্রিক বাথটাবে গোসল করে। তাই বিদ্যুৎ সাশ্রয় কম সময়ে গোসল করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেনডেনমার্ক সরকার। পাশাপাশি ড্রাইওয়াশিং মেশিনে কাপড় না শুকিয়ে বাসা বাড়ির খোলা জায়গায় কাপড় শুকানো রহমানও জানিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে বাসাবাড়িতে পুরনো এসি ও ফ্রিজ ব্যবহার না করতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন গ্রিস সরকার। এমনকি নতুন এসি ও ফ্রিজ কিনতে জনগণকে ৪০ থেকে ৫০ ভাগ পর্যন্ত অর্থ ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। এভাবে গ্যাস বাবদ প্রায় ৪ কোটি ইউরো সাশ্রয়ের চেষ্টা করছে গ্রিস সরকার। সুপারমলগুলোতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছে ফ্রান্স সরকার। এমনকি সুপার মলগুলো বন্ধুরা রাখার পর নির্দেশনামূলক বিলবোর্ডও বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়েছে সে দেশের সরকার। মূল্যস্ফীতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬%।
অস্ট্রেলিয়ায় ৮০ লক্ষ মানুষকে বৈদ্যুতিক বাতি বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। দেশটির রাজধানীর সিডনি এবং সবচাইতে বড় শহর নিউ ওয়েলসের বাসিন্দাদের দিনে দুই ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। প্রয়োজনে সন্ধ্যায় ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ রাখার আহ্বান সরকারের। জাপানের মত বিশাল অর্থনীতির দেশটিও বিদ্যুৎ সাশ্রয়করতে জনগণকে নানা ধরনের নির্দেশনা দিয়েছে। বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া, নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত বাতি বন্ধ রাখা এবং নির্দিষ্ট একটি সময়ে রাস্তাঘাটে ইলুমিনিটিং বাতি বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে জাপান সরকার। গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। ফলে জনজীবনে তৈরি হয়েছে নানা দুর্ভোগ, ব্যাহত হচ্ছে শিল্প উৎপাদন।
রাশিয়ার তেল ও গ্যাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচাইতে বিপাকে পড়েছে জার্মানি। জার্মানির জনজীবন যেমন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে তেমনি সবচেয়ে বেশি ব্যাহত হচ্ছে তার শিল্প উৎপাদন এবং দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে বেকারত্ব। জ্বালানি সংকট দূর করতে জার্মান সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে এবং শুরু করেছে বিদ্যুৎ রেশনিং। গ্যাস সংকট মোকাবেলায় হেনোভার প্রদেশে গরম পানির ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে সরকার।আসছে শীত মৌসুমে জ্বালানি সংকটের কথা বিবেচনা করে জনমনে এখনি আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। হাঙ্গেরি, ইউক্রেনসহ অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর অবস্থাও একইরকম।
শুধু ইউরোপ নয়, এশিয়া ও আফ্রিকাসহ সমগ্র বিশ্বেই জ্বালানি ওখাদ্য সংকট চরমে আকার ধারন করছে। উপর্যুক্ত বাস্তবতায় জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সাশ্রয়ে বাংলাদেশের সরকার সতর্কতামূলক নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ১৯ জুলাই ২০২২ থেকে সারাদেশে এলাকা ভিত্তিক এখন বা দুই ঘন্টা ধরে লোডশেডিং করা বা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সেই সঙ্গে সপ্তাহে একদিন পেট্রোল পাম্প বন্ধ রাখারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। জ্বালানিখাতে লোকসান কমাতে ডিজেল-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো গত ১৯ জুলাই থেকেই বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে দৈনিক এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি হতে পারে। এ অবস্ছায় মসজিদ, মন্দির বা উপাসনালয়গুলোতেও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হবার কথা বলা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠাগুলো সপ্তাহে দু'দিন বন্ধ রাখা যেতে পারে। লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবনে দুর্ভোগ হবে এটাই স্বাভাবিক তবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের সবাইকে সচেতনভাবে এগিয়ে এসে এ সাময়িক দুর্ভোগকে মেনে নিতে হবে।
ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কা ও ব্রিটেনে সরকার পতন হয়েছে, ইতালিতে সরকারের প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। জ্বালানির পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট। ডলারের বিপরীতে গত ২৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে ইউরোর দাম। ইউরোপের পাশাপাশি এশিয়া ও আফ্রিকার অবস্থাও শোচনীয়। আফ্রিকার কোনো কোনো দেশতো দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।বিভিন্ন দেশে নিজস্ব মুদ্রার মান দ্রুত নিম্নমুখী হচ্ছে। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে ডলারে বিপরীতে মুদ্রার মান ব্যাপকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে ১ ডলারে ৮০ রূপি-যা সর্বকালের সর্বনিম্ন মান। ভারতে অর্থনীতিতে এখন টালমাটাল অবস্থা। পাকিস্তানের অবস্থাতো আরও ভয়াবহ। মুদ্রাস্ফীতিতে নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছে দেশটি। বাংলাদেশের ১ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে পাকিস্তানি ২ রূপিরও বেশি। ২০২২ সালে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে ১২.৭ ভাগ। সুতরাং দেখা যায় মহামন্দার দিকে এগিয়ে চলেছে পুরো বিশ্ব। তবুও রাশিয়ার উপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করবে না পশ্চিম বিশ্ব। বৃহৎ শক্তির ইগো ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার এক নোংরা রাজনীতির শিকার আজ বিশ্বের সাধারণ জনগণ। এ অবস্থায় আমাদের সবাইকে ধৈর্যশীল হয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক শিক্ষক পরিষদ, ঢাকা কলেজ
৭ ঘন্টা ৩৪ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে
৯ ঘন্টা ১৯ মিনিট আগে
১০ ঘন্টা ২৩ মিনিট আগে
১ দিন ৫০ মিনিট আগে
১ দিন ৫১ মিনিট আগে
১ দিন ৫৪ মিনিট আগে