নদী-খালে কীটনাশক ছড়িয়ে মাছ শিকারে মরছে মাছ, চিংড়ি ও কাঁকড়া; ১০ মাসে ৪০৩ মামলা, গ্রেপ্তার ৩৯৪ জন—নজরদারি ও ড্রোনে বন অপরাধ দমনের চেষ্টা
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠেছে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার। নদী ও খালে কীটনাশক ছড়িয়ে মাছ ধরার কারণে শুধু মাছ নয়, মারা পড়ছে চিংড়ি, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ প্রাণী। এতে বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে জলজ খাদ্যশৃঙ্খল ও বনের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র। এমন পরিস্থিতিতে বন অপরাধ দমনে নজরদারি জোরদার করেছে বন বিভাগ। বন্যপ্রাণী শিকার ও বিভিন্ন বন অপরাধে জড়িত সন্দেহে ১৩৫ জনের একটি বিশেষ তালিকা তৈরি করে তাঁদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে বন অপরাধের অভিযোগে ৪০৩টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৯৪ জনকে। একই সময়ে বিভিন্ন অভিযানে জব্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সরঞ্জাম, হরিণের মাংস, মাছ, কাঁকড়া ও কীটনাশক। তবে বন বিভাগের দেওয়া পরিসংখ্যানে মামলা ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা নিয়ে কিছু অসংগতি রয়েছে।
বিষ প্রয়োগে বিপন্ন জলজ বাস্তুতন্ত্র
সুন্দরবনের নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার দীর্ঘদিনের উদ্বেগজনক অপরাধ। অসাধু মাছ শিকারিরা মাছের বিচরণক্ষেত্র শনাক্ত করে পানিতে কীটনাশক ছড়িয়ে দেয়। এতে নির্দিষ্ট প্রজাতির মাছের পাশাপাশি চিংড়ি, কাঁকড়া, জলজ কীটপতঙ্গ ও অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীও মারা যায়। বিষাক্ত পানির প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে। এর ফলে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের বিভিন্ন নদী-খালে বনরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ‘রিপকর্ড’সহ ভারতীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কীটনাশক প্রয়োগ করে চিংড়ি শিকারের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি নিষিদ্ধ ভেসালি জাল দিয়ে নির্বিচারে ছোট মাছ ধরার ঘটনাও ঘটছে।
বনের ছিচখালি, কেওড়াসুতি, হংসরাজ, দুধমুখ, কাগা দোবেকি, পাটকোষ্টা, গেড়া চালকি, মার্কি, আন্দারমানিক, শাপখালি, বাটলু, নোটাবেকি, পুষ্পকাঠি ও কাটেশ্বর এলাকার নদী-খালেও এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পশুর নদী, জয়মনি, কচিখালি, হড্ডা, শিবশা, নীলকমল, বজবজা ও খাসিটানা এলাকাতেও বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগ রয়েছে।
সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরলে শুধু লক্ষ্যবস্তু মাছ নয়, অন্যান্য জলজ প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিষাক্ত পদার্থ পানিতে ছড়িয়ে পড়লে জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দূষিত মাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমেও মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে সুন্দরবনে ব্যবহৃত বিষের রাসায়নিক উপাদান, পানিতে এর স্থায়িত্ব এবং জীববৈচিত্র্য ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
১০ মাসে জব্দ বিপুল পরিমাণ অবৈধ সরঞ্জাম
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ মাসে সুন্দরবনের গভীর অরণ্য থেকে নদী-খাল পর্যন্ত নিয়মিত অভিযান ও টহল পরিচালনা করা হয়েছে। হরিণ শিকার, অবৈধভাবে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারসহ বিভিন্ন বন অপরাধের অভিযোগে এসব মামলা করা হয়।
এ সময়ে অভিযানে জব্দ করা হয়েছে ২ হাজার ৮৯২ মিটার হরিণ ধরার ফাঁদ, ৫২২ কেজি হরিণের মাংস, ২৯টি ট্রলার, ৪০৫টি নৌকা, ৪৮৩টি অবৈধ কাঁকড়া ধরার আটন, ৯ হাজার ৫৩২ মিটার দোন দড়ি, ৩ হাজার ৭৬০ কেজি মাছ এবং অবৈধভাবে আহরিত ৪ হাজার ১৪২ কেজি কাঁকড়া। এ ছাড়া ১৮৮ বোতল অবৈধ কীটনাশক ও ১ হাজার ২৭৩ কেজি মধু জব্দ করা হয়েছে।
১৩৫ জনের বিশেষ তালিকা, বাড়ছে নজরদারি
বন্যপ্রাণী শিকার ও বন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং তাঁদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগ ১৩৫ জনের একটি বিশেষ তালিকা তৈরি করেছে। তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি বন অপরাধ দমনে স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির কর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাজমিনুল ইসলাম যোগদানের পর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমানের পরামর্শে হরিণ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী শিকার এবং বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা বন্ধে বিশেষ উদ্যোগ নেন। এ বিষয়ে স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির কর্মীদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বিভিন্ন অভিযানে অবৈধ জাল, নৌকা, আটনসহ বন অপরাধে ব্যবহৃত সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। রেঞ্জ কর্মকর্তা নিজেও কয়েকটি অভিযানে অংশ নিয়ে অপরাধীদের আটক করতে ভূমিকা রেখেছেন।
বন প্রহরীদের দাবি, নিয়মিত অভিযান ও নজরদারির কারণে খুলনা রেঞ্জে বন অপরাধের প্রবণতা আগের তুলনায় কমেছে। তবে জনবল সংকট ও আধুনিক সরঞ্জামের অভাব দূর করা না গেলে দীর্ঘ মেয়াদে এ সাফল্য ধরে রাখা কঠিন হবে।
দুর্গম বনে ঝুঁকি নিয়ে টহল, নজরদারিতে ড্রোন
সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, বনরক্ষীরা চরম ঝুঁকি ও প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে বনের দুর্গম এলাকায় পায়ে হেঁটে এবং নদীপথে নিয়মিত টহল দিচ্ছেন। পায়ে হেঁটে টহলের পাশাপাশি ড্রোনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ফলে বন অপরাধ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
জনবল ও সরঞ্জামের সংকটে সুন্দরবন সুরক্ষা
বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবনের বিশাল বনাঞ্চল সুরক্ষায় নিয়মিত টহল কার্যক্রম অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় এবং আধুনিক জলযানের অভাবে কার্যকরভাবে টহল পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে দুর্গম নদী ও খালগুলোতে নিয়মিত নজরদারি চালানো বড় চ্যালেঞ্জ।
তাঁদের মতে, জনবল সংকট নিরসন, আধুনিক জলযান ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা গেলে বনজ সম্পদ রক্ষা, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং বন অপরাধ দমনে টহল কার্যক্রম আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, বিশাল আয়তনের সুন্দরবনের বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বন বিভাগের কর্মীরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে অল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে এত বড় বনাঞ্চল রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বনকর্মীদের সুযোগ-সুবিধা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বাড়ানো জরুরি। সবার সহযোগিতায় আগের তুলনায় বন অপরাধের প্রবণতা অনেক কমেছে।
সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার কেবল একটি বন অপরাধ নয়, এটি গোটা জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করছে। তাই অপরাধীদের শনাক্ত ও শাস্তির পাশাপাশি বিষের উৎস, ব্যবহার এবং পরিবেশগত ক্ষতি নিরূপণে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানও জরুরি।